অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বৃহঃস্পতিবার, ১৪ই মে ২০২৬ | ৩১শে বৈশাখ ১৪৩৩


হামে ৪৩২ শিশুর মৃত্যু: মায়েদের কোল ভরা রাখাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৪ই মে ২০২৬ সকাল ১০:০২

remove_red_eye

৩৭

হাসপাতালের শিশু ওয়ার্ডে বাড়ছে কান্না আর উৎকণ্ঠা। জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও ফুসকুড়ি নিয়ে প্রতিদিন ভর্তি হচ্ছে নতুন নতুন শিশু।

আইসিইউয়ের বাইরে উদ্বিগ্ন মায়েদের দীর্ঘ অপেক্ষা। গত দুই মাসে দেশে হামে আক্রান্ত হয়ে সরকারি হিসাবে মারা গেছে ৪৩২ শিশু।
 
আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে প্রায় ৩৬ হাজার শিশু। ভয়াবহ এ পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বলছে, এখন তাদের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য ‘মায়েদের কোল ভরা রাখা’।

 

বুধবার (১৩ মে) সচিবালয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হামের টিকা নিয়ে কে দোষ করেছে, সেটা খোঁজার আগে মায়েদের কোল ভরা রাখতে হবে। আমরা এখন সেটাই করার চেষ্টা করছি।

 

তিনি জানান, ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী প্রায় সব শিশুকে টিকার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে। যারা এখনো বাদ পড়েছে, তাদের দ্রুত টিকা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে শিগগিরই ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইন শুরু হবে।

তবে জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হলেও আক্রান্ত ও মৃত্যুর হার এখনো উদ্বেগজনক। 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকার ঘাটতি নয়- স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্বলতা, চিকিৎসা নিতে দেরি, অপুষ্টি, নিউমোনিয়া এবং দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনাও শিশু মৃত্যুর বড় কারণ।

টিকার কভারেজে ধাক্কা

সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচির (ইপিআই) তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছর দেশে হামের টিকাদানের হার ছিল সন্তোষজনক। ২০২১ সালে এমআর টিকার কভারেজ ছিল ৯৯ দশমিক ৭ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে ৯৩ দশমিক ৮ শতাংশে নেমে এলেও ২০২৩ সালে বেড়ে হয় ৯৭ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৪ সালে কভারেজ প্রায় ৯৮ শতাংশে পৌঁছায় এবং দ্বিতীয় ডোজ নেওয়ার হার ছিল ৯৬ শতাংশ।

তবে চলতি বছরের মার্চে ইপিআইয়ের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের টিকাদান কভারেজ ৫৯ শতাংশ দেখানো হয়। পরে সেই তথ্য সরিয়ে নেওয়া হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, কয়েক মাস স্বাস্থ্য সহকারীরা নিয়মিত তথ্য আপলোড না করায় ড্যাশবোর্ডে কভারেজ কম দেখাচ্ছিল।

ইপিআইয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে স্বাস্থ্য সহকারীরা তিন দফা কর্মবিরতি পালন করেন। একই সময়ে ২০২৪ সালে অপারেশন প্ল্যান (ওপি) বন্ধ হয়ে যাওয়ায় মাঠপর্যায়ের টিকাদান কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

টিকা পাওয়ার আগেই মৃত্যু

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ন্যাশনাল ইপিআই সার্ভিল্যান্সের তথ্য অনুযায়ী, নিশ্চিত হামে আক্রান্ত শিশুদের ৩৪ শতাংশের বয়স ছিল নয় মাসের কম। অর্থাৎ তারা তখনো নিয়মিত টিকা পাওয়ার বয়সে পৌঁছায়নি।

আক্রান্তদের মধ্যে এক ডোজ টিকা নেওয়া শিশুর হার ১৪ দশমিক ১ শতাংশ এবং দুই ডোজ নেওয়া শিশু ১১ দশমিক ৭ শতাংশ।

এদিকে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ম্যানেজমেন্ট ইনফরমেশন সিস্টেম (এমআইএস) শাখা হামে মারা যাওয়া ৬০ শিশুর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, তাদের মধ্যে ২৯ শিশুর বয়স ছিল তিন থেকে আট মাসের মধ্যে। অর্থাৎ প্রায় অর্ধেক শিশুই টিকা পাওয়ার আগেই মারা গেছে।

আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার দুই দিনের মধ্যেই ৪০ শতাংশ শিশুর মৃত্যু হচ্ছে। তবে আক্রান্ত শিশুরা কত দিন পর হাসপাতালে এসেছে বা কী ধরনের জটিলতা ছিল, সে বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ বিশ্লেষণ হয়নি।

শুধু টিকা নয়, আরও কারণ আছে

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু টিকা না নেওয়াকে দায়ী করলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা যাবে না।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ) অধ্যাপক ডা. বেনজির আহমেদ বলেন, বর্তমানে হামের প্রকোপ মহামারির পর্যায়ে পৌঁছেছে। সরকার চাইলে এটিকে স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে পারত। তাহলে মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল, চিকিৎসক ও পরিবার সবার মধ্যেই আরও বেশি জরুরি প্রস্তুতি তৈরি হতো।

তিনি বলেন, টিকার কভারেজ যত বাড়বে, সংক্রমণ তত কমবে। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে বিস্তারিত গবেষণা প্রয়োজন।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা জানান, গত ৩০ বছরে দেশে হাম নিয়ে তেমন গবেষণা হয়নি। অপুষ্টি, নিউমোনিয়া, ভিটামিন ‘এ’-এর ঘাটতি এবং শিশুদের বুকের দুধ কম খাওয়ানোর বিষয়গুলোও মৃত্যুর সঙ্গে সম্পর্কিত।

তাদের মতে, শুধু টিকা দিলেই পরিস্থিতি পুরো নিয়ন্ত্রণে আসবে না। আক্রান্ত শিশুকে দ্রুত হাসপাতালে আনা, সময়মতো চিকিৎসা এবং পুষ্টি নিশ্চিত করাও জরুরি।

জরুরি স্বাস্থ্য অবস্থা ঘোষণার দাবি

পরিস্থিতির ভয়াবহতায় জনস্বাস্থ্যবিদরা হামের প্রাদুর্ভাবকে ‘স্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা’ হিসেবে ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছেন।

তাদের মতে, বর্তমানে ছয় মাস থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেওয়া হলেও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে আসতে সময় লাগবে। কারণ হাম-রুবেলা টিকা নেওয়ার পর শরীরে রোগ প্রতিরোধী অ্যান্টিবডি তৈরি হতে সাধারণত তিন সপ্তাহ সময় লাগে।

‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে

দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন উপলক্ষে বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, দুর্বল নজরদারি এবং নিয়মিত ক্যাম্পেইন বন্ধ থাকায় বর্তমান পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

তিনি বলেন, ২০২০ সালের পর দেশে আর কোনো বড় ধরনের হামবিরোধী ক্যাম্পেইন হয়নি। ফলে বহু শিশু নিয়মিত টিকার বাইরে থেকে গেছে। কাগজে-কলমে কভারেজ বেশি দেখানো হলেও বাস্তবে অনেক শিশু টিকা পায়নি।

তার অভিযোগ, আগের সরকারের সময়ে টিকাদান কার্যক্রমের বাস্তব চিত্র আড়াল করা হয়েছিল। এতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ভুল ধারণা তৈরি হয় যে প্রায় সব শিশু টিকার আওতায় আছে।

ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, আমরা দায়িত্ব নেওয়ার পর বুঝতে পারি, দেশে বড় ধরনের ‘ইমিউনিটি গ্যাপ’ তৈরি হয়েছে। অর্থাৎ অনেক শিশুর শরীরে হামের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নেই। সেই সুযোগেই ভাইরাস দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে।

তিনি জানান, পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি ভিত্তিতে দেশব্যাপী হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন শুরু করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রায় এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, শুধু শহর নয়, গ্রামের প্রত্যন্ত অঞ্চল, বস্তি, চা-বাগান ও পাহাড়ি এলাকাতেও শিশুদের খুঁজে খুঁজে টিকা দেওয়া হচ্ছে। এখন একটি শিশুও বাদ পড়ার সুযোগ নেই।

তিনি আশা প্রকাশ করে বলেন, মে মাসের শেষ দিক বা জুনের শুরু থেকে সংক্রমণ কমতে শুরু করতে পারে।

তদন্তের ইঙ্গিত

টিকাদানে অব্যবস্থাপনার জন্য কাউকে দায়ী করা হবে কি না এমন প্রশ্নে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, এখন আমরা সংকটকাল পার করছি। এ সংকট শেষ হলে কেন্দ্রীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

তিনি আরও বলেন, সামনে ডেঙ্গু, পোলিওসহ আরও কয়েকটি সংক্রামক রোগের ঝুঁকি রয়েছে। ফলে স্বাস্থ্য খাতের জন্য এটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।