অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, রবিবার, ১০ই মে ২০২৬ | ২৬শে বৈশাখ ১৪৩৩


মহান মুক্তিযুদ্ধে লালমোহনে  মোহাম্মদ আলীর বীরত্ব


লালমোহন প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১০ই ডিসেম্বর ২০২২ রাত ০৯:১৪

remove_red_eye

৪৩৯



মো. রুহল আমিন, লালমোহন : ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর। দিনটি ছিল সোমবার। এদিন ভোলার হাই কমান্ড ছিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বে পরিকল্পনা নেয়া হয় লালমোহন থানা অ্যাটাক করার। যেখানে রাজকার ও আলবদরদের অবস্থান ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) ভোর ৪টা থেকেই ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা মিলে থানার তিন পাশ ঘিরে গুলি বিনিময় শুরু করি। থানায় অবস্থান করা রাজাকার-আলবদর ও আমাদের গুলি বিনিময়ে এসময় প্রাণ হারান ৩ জন সাধারণ মানুষ।
আমাদের আক্রমণে রাজাকার-আলবদররা না সরলেও থানা ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয় পুলিশ সদস্যরা। অবশেষে প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে আত্মসমর্পণে বাধ্য হয় ৪০ থেকে ৪৫ জনের রাজাকার-আলবদরের একটি দল। এভাবেই মুক্তিযোদ্ধকালীন সময়ের লালমোহন থানাকে রাজাকার-আলবদর মুক্ত করার ঘটনা ‘দৈনিক বাংলার কণ্ঠের প্রতিনিধি সঙ্গে স্মৃতিচারণ করেন লালমোহনের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলী। তিনি লালমোহন পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নয়ানীগ্রাম এলাকার চৌকিদার  বাড়ির মৃত সেরাজল হকের ছেলে। ৬ ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ততৃীয়।১৯৭১ সালে নিজ মাতৃভূমিকে পাকহানারদার মুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন মোহাম্মদ আলী।
সে সময়ের বিস্তারিত ঘটনা উল্লেখ করে তিনি আরো বলেন, ৭১’র ১০ এপ্রিল লালমোহন সংগ্রাম পরিষদের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারীদের তালিকা করা হয়। ধলীগৌরনগর ইউনিয়নের বাদশা মিয়ার ছেলে লে. নাছির উদ্দিন ও গাউছ আহমেদ মুন্সির ছেলে আবু ছায়েদ মিয়ার নেতৃত্বে নৌকাযোগে ১৪ এপ্রিল ২৮ জন মুক্তিযোদ্ধা বরিশালের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হই। এদের মধ্যে সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরাও ছিলেন। আমি তখন আনসার সদস্য ছিলাম। ২দিন নৌকার দাড় বেয়ে ১৬ এপ্রিল বরিশাল ঘাটে পৌছে ‘ভিলেজ পার্ক’ মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে যোগদান করি। ওই ক্যাম্পের অধিনায়ক ছিলেন মেজর এমএ জলিল।
মোহাম্মদ আলী বলেন, সেখানে ১০ দিনের অস্ত্র প্রশিক্ষণ শেষে আমাদেরকে থ্রিনটথ্রি ও মারেকফোর রাইফেল নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় পাঠানো হয়। আমাদের গ্রæপের প্রথম অপারেশন হয় ২৭ এপ্রিল। আমরা এক প্লাটুন বাহিনী বরিশাল বেলতলী এলাকায় বিহারী পাড়ায় আক্রমণ চালাই। সেখানে পাকিস্তানী দুইজন সুবেদার ও ২জন সিপাহীর বাসা ছিল। তাদেরকে পাকড়াও করে বরিশাল ভিলেজ পার্ক ক্যাম্পে আনি। পরে তাদেরকে কীর্তনখোলা নদীর তীরে গুলি করে মারা হয়। এ অপারেশনের নেতৃত্ব দেন লালমোহনের চরভূতা এলাকার সুবেদার আবুল কাশেম। ওই সময় সহযোগি কমাÐার ছিলেন আবু ছায়েদ মিয়া।
তিনি আরো বলেন, পরে কাউয়ার চরের আব্দুল খালেক হাবিলদার ও লালমোহনের আবু ছায়েদ মিয়ার নেতৃত্বে আমাদের ১৮ জনকে পাঠানো হয় বরিশালের টুঙ্গিবাড়ি। আমাদের কাজ ছিল লঞ্চ ও স্টীমার ঘাটে ভিড়লে তা চেক করা। এছাড়াও  নদীর পাড়ে গর্ত করে অস্ত্র তাক করে পাহারা দিতাম। এভাবে দেড় মাস থাকার পর ১৩ জুন ওই ১৮ জনকে বরিশাল তালতলি নদীর পাড়ে পাঠানো হয়। সেখানে ১৯ জুন উত্তর থেকে আসা পাঞ্জাবীদের ৩টি শীপ লক্ষ্য করে আমরা গুলি ছুড়ি। পাঞ্জাবিরাও পাল্টা গুলি ছুড়ে। ৩ ঘন্টা গোলাগুলি চলার পরও আমরা কুলিয়ে উঠতে না পেরে থেমে যেতে বাধ্য হই। অবশেষে পাঞ্জাবীদের শীপ ঘাটে ভিড়েই কাটপট্টি এলাকায় আগুন লাগিয়ে দেয়।
মোহাম্মদ আলী বলেন, পরদিন ২০ জুন আমিসহ লালমোহনের ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধা জেলেদের নৌকায় করে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। ২২ জুন আমরা লালমোহন পৌঁছে উপজেলা সংগ্রাম পরিষদের সঙ্গে সাক্ষাত করি। তখন সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে ছিলেন মোখলেছুর রহমান, সোলায়মান হাওলাদার, মোজাম্মেল তালুকদার, কালিরটেকের মোজাফ্ফর কেরানী, জয়নাল পাটোয়ারী, কানু পঞ্চায়েত। সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি ছিলেন তৎকালিন এমপি গজারিয়ার মোতাহার মাষ্টার। এরমধ্যে আমাদের মুক্তিযোদ্ধা আবু ছায়েদকে ধরে নিয়ে যায় পাকবাহিনী। পরদিন পাকবাহিনীরা ফুলবাগিচা গ্রামের ছাবেদ আলীর ছেলে আব্দুস শহিদকেও আটক করে উভয়কে ভোলা খেয়াঘাটে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর লালমোহনের লাঙ্গলখালীতে ৩০ সদস্যের এক প্লাটুন পাকবাহিনী এসে অবস্থান নেয়। তারপর থেকেই লালমোহনের মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এতে করে বেশ কিছুদিন আত্মগোপনে থাকতে হয় আমাদের। পরে এখান থেকে ওইসব পাকবাহিনীরা চলে যাওয়ার পর পূণরায় সংগঠিত হতে শুরু করি আমরা। সকলে আবার একত্রি হতে বেশ কিছুদিন সময় লাগে।
লালমোহন থানা মুক্ত করার ভূমিকার কথা উল্লেখ করে মোহাম্মদ আলী বলেন, ১৯৭১ সালের ২৫ অক্টোবর লালমোহন থানাকে পাক হানাদার মুক্ত করতে ভোলার হাই কমাÐ ছিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বে পরিকল্পনা করা হয়। তাই বৃহস্পতিবার (২৮ অক্টোবর) ভোর ৪টা থেকে আমরা ৩০ জন মুক্তিযোদ্ধা লালমোহন থানার তিন পাশ ঘিরে রাখি। থানার পশ্চিম পাড়ে পোষ্ট অফিস, খাসমহল পুকুর পাড়, উত্তর পাশে রাইমোহন কুÐের বাড়ির পুকুর পাড়, পূর্ব পাশে ডাক্তারখানা। এখান থেকেই আমরা অস্ত্র নিয়ে গুলি ছুড়তে শুরু করি। এসময় আমাদের আক্রমণে টিকতে না পেরে থানায় থাকা পুলিশরা পালিয়ে যায়। তবে রাজাকার ও আলবদর বাহিনীর ৪০ থেকে ৪৫ জন থানার ভিতরে অবস্থান নিয়ে আমাদেরকে প্রতিহত করতে পাল্টা গুলি বর্ষণ করতে থাকে। এ সময় উভয় পক্ষের গুলি বিনিময়কালে ৩জন সাধারণ মানুষ মারা যায়। এদের মধ্যে সকাল ১০টার দিকে বর্তমান পৌরশহরের করিম রোডের মাথায় চরভূতা ইউনিয়নের মকবুল খনকারের গায়ে গুলি লাগলে ঘটনাস্থলে তিনি মারা যান। ১২টার দিকে থানার পূর্ব পাশে বাগান বাড়ির দরজায় শান্তির বাপ হিসেবে পরিচিত মনোরঞ্জনের গায়ে গুলি লাগলে তিনিও নিহত হন। ১টার দিকে থানার দোতলায় থাকা বাবুর্চি উত্তর পাশের জানালা দিয়ে উঁকি দেয়ার সময় গুলিতে তার মাথার খুলি উড়ে যায়।
মোহাম্মদ আলী জানান, এরই মধ্যে আমাদের পক্ষ থেকে থানায় অবস্থানকারী রাজাকার ও আলবদর সদস্যদেরকে আত্মসমর্পণের আহবান জানিয়ে মাইকিং করেন থানা শান্তি কমিটির সভাপতি মাওলানা ফয়েজউল্যাহ। এরপরও তারা গুলি চালাতে থাকে। এক পর্যায়ে বেলা আড়াইটার দিকে আমাদের প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে মাঠে নেমে দুই হাত তুলে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয় রাজাকার-আলবদররা। পরে আমরা থানায় ঢুকে সকল অস্ত্র-সস্ত্র ও গোলাবারুদ দখলে নিয়ে থানায় থাকা কাগজপত্রে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেই। এভাবেই ভোলার হাই কমান্ড ছিদ্দিক মিয়ার নেতৃত্বে লালমোহন থানাকে মুক্ত করা হয়।
তিনি আরো জানান, এরপর থেকে ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্নস্থান হতে থাকে পাকহানাদার মুক্ত। এরপর ঘোষণা আসে স্বাধীন বাংলাদেশের। পরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নির্দেশ দেন নির্দিষ্ট স্থানে যার যার অস্ত্র জমা দেয়ার। বঙ্গবন্ধুর ওই নির্দেশনা মেনে আমরাও ১৭ ডিসেম্বর ভোলার ওফদা ক্যাম্পে গিয়ে ক্যাম্প কমাÐার ক্যাপ্টেন আলীর কাছে অস্ত্র জমা দেই। অস্ত্র জমা দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বীকৃতিস্বরূপ সনদ প্রদান করেন মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক আতাউল গণি ওসমানী।
বঙ্গবন্ধু কন্যা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে মোহাম্মদ আলী বলেন, ২০০০ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে প্রথম ৩ শত টাকা সম্মানী পাই। বর্তমানে এ সম্মানীর পরিমাণ হয়েছে ২০ হাজার টাকা। আওয়ামীলীগ সরকারের আমলেই আমাদের মত মুক্তিযুদ্ধাদের সবচেয়ে বেশি সম্মান করা হয়। এজন্য বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।






জিজেইউএসের মাঠকর্মীদের সতেজীকরণ প্রশিক্ষণের উদ্বোধন

জিজেইউএসের মাঠকর্মীদের সতেজীকরণ প্রশিক্ষণের উদ্বোধন

চরফ্যাশন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নবজাতক শিশু রেখে চলে গেলেন মা

চরফ্যাশন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নবজাতক শিশু রেখে চলে গেলেন মা

মানুষের সমর্থন পেয়েছি, এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা: প্রধানমন্ত্রী

মানুষের সমর্থন পেয়েছি, এখন প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের পালা: প্রধানমন্ত্রী

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সহযোগিতায় দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে সহযোগিতায় দলীয় নেতাকর্মীদের প্রতি আহ্বান প্রধানমন্ত্রীর

বিএনপিসহ দলের তিন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী

বিএনপিসহ দলের তিন অঙ্গসংগঠনের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধানমন্ত্রী

কলেজ শিক্ষার্থী ওয়াকিমুলের তৈরি স্মার্ট কারে চড়লেন প্রধানমন্ত্রী

কলেজ শিক্ষার্থী ওয়াকিমুলের তৈরি স্মার্ট কারে চড়লেন প্রধানমন্ত্রী

কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার লাইফ সাপোর্টে

কনটেন্ট ক্রিয়েটর কারিনা কায়সার লাইফ সাপোর্টে

দরকষাকষিতে ঝুলে আছে বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রিত্ব

দরকষাকষিতে ঝুলে আছে বিজয়ের মুখ্যমন্ত্রিত্ব

দেশের ক্ষতি হলে নীরবে বসে থাকব না: জামায়াত আমির

দেশের ক্ষতি হলে নীরবে বসে থাকব না: জামায়াত আমির

সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৫০,১১১ বাংলাদেশি হজযাত্রী

সৌদি আরবে পৌঁছেছেন ৫০,১১১ বাংলাদেশি হজযাত্রী

আরও...