অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, রবিবার, ২০শে জুন ২০২১ | ৬ই আষাঢ় ১৪২৮


ভোলায় ১১ হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্থ


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৯শে মে ২০২১ রাত ১১:২২

remove_red_eye

৭৭

ঘূর্ণিঝড় ইয়াসে সহায়সম্বল হারা পরিবার গুলোর মানবেতর জীবনযাপন

নাসির লিটন : ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব কেটে স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে ভোলার উপকূলীয় এলাকার চরাঞ্চল। কমতে শুরু করেছে নোনা পানির জোয়ার। কিন্তু কমেনি দূর্গত এলাকার মানুষ ভোগান্তি। এদিকে গত তিনদিনেও ক্ষয় ক্ষতির হিসাব চুড়ান্ত করতে পারেনি স্থানীয় প্রশাসন। তবে প্রাথমিক তথ্যে জানা যায়, ইয়াসের মৃদু প্রভাবেই দ্বীপজেলা ভোলার সাত উপজেলার ৫১ ইউনিয়নের ৬৫৯টি গ্রাম আক্রান্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে ১১ হাজার ৩০৯টি পরিবার। গৃহহারা পরিবারের সংখ্যা ৩ হাজার ৫৭৯ ও আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ ৭ হাজার ৭৩০ পরিবার। এতে সরাসরি আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় পৌনে ২ লাখ মানুষ। জোয়ারে ভাসিয়ে নিয়েছে কয়েক হাজার গরু- মহিষ। নি¤œাঞ্চলের মানুষ সামান্য কিছু শুকনো খাবার পেলেও ঘুরে দাড়ানোর মতো কোন সহায়তা না পেয়ে হতাশা। এদিকে ঘরবাড়ির পরই বেশি ক্ষতি হয়েছে গবাদি পশুর। ২দিনের অতিজোয়ারে জেলার বিভিন্ন চর থেকে ৫ হাজার মহিষ ভেসে গেছে বলে জানা গেছে। নোনা পানির কারণে চরঞ্চালের মহিষের মড়ক দেখা দিয়েছে। বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নিয়েও  নতুন করে শংকা সৃষ্টি হয়েছে। বুধবারের জলোচ্ছ¡াসে মেঘনা তেঁতুলিয়া পাড়ের ৫০টি স্থানে প্রায় ১৬ বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে।  
সাগর কুলের ইউনিয়ন ঢালচরের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদার জানান, তার ইউনিয়নের ১শ’ বসত ঘর ও অর্ধশতাধিক মাছের আড়ত সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। আংশিক ক্ষতির স্বীকার হয়েছে ইউনিয়নের সব বাসিন্দা। বাগানে থাকা কয়েক হাজার গরু-মহিষ ভেসে গেছে তার সংখ্যা নিরুপনের চেস্টা চলেছে। জোয়ারের পানি কিছুটা কমতে শুরু করলে এখনও নোনা পানিমুক্ত হয় নি। এতে বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে ১শ’ মানুষকে শুকনো খাবার ছাড়া আর কিছু দেয়া হয়নি। সবকিছু তলিয়ে থাকায় এবং জ্বালানি সংকটের কারণে খাবার রান্না করতে পারছেনা। এতে খাদ্য সংকট তীব্র হচ্ছে। ভোগান্তিতে থাকা এসব মানুষের জন্য চাল-ডাল সহ খাদ্য সামগ্রী ও গৃহনির্মাণ উপকরণ জরুরী বলে ইউপি চেয়ারম্যান দাবি করেন। নোনা পানি খেয়ে  গরু মহিষ মড়ক দেখা দিয়েছে বলেও জানান তিনি। ঢালচরের মতোই একই অবস্থা চর কুকরী মুকরী ও চর পাতিলায়। চরপাতিলার ইউপি সদস্য বাদশা মিয়া জানান, মাথা গোজাবার জন্য ঘর প্রস্তুত করাই পাতিলার বাসিন্দাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। দরিদ্র চরবাসীকে গৃহসামগ্রী দিয়ে সহায়তা করলে ভালো হবে। শুক্রবার রাত থেকে জোয়ারের উচ্চতা কমলেও খাল-বিল ভরে থাকা নোনা পানির কারণে নানা সংকট দেখা দিয়েছে। এ মুহুর্তে মহিষ গরু নিয়ে বিপাকে পড়েছে চাষীরা। মিঠা পানি আর গৌখাদ্যের সংকট চরমে। এই দুই ইউনিয়নের মতোই চর নিজাম, কলাতলির চর, চর জহির উদ্দিন, মদনপুর, নেয়ামতপুর, মাঝের চর ও রাজাপুরের দুর্গত এলাকাও পানি কমতে শুরু করেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্থদের দুর্ভোগ একই রকম।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, মেঘনা- তেঁতুলিয়ার জলোচ্ছ¡াস থেকে ভোলাকে রক্ষা করতে রক্ষাকবজ হিসেবে কাজ করছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩২৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ। এর মধ্যে ১১৪ কিলোমিটার স্থায়ী প্রটেকশন থাকলেও বাকী এলাকার নিরাপত্তা মাটির বাঁধের উপরই নির্ভর করছে। গত বুধবার ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে বিপদ সীমার প্রায় ১মিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত জোয়ারের আঘাতে  সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে মনপুরা উপজেলার সোনারচর, দক্ষিণ সাকুচিয়া, কুলাগাজির তালুক ও ¯øুইজগেট এলায় প্রায় ৪ কিলোমিটার বাঁধ। এছাড়া সদর উপজেলার ১৩টি স্থানে প্রায় ২ কিলোমিটার, দৌলতখান ও বোরহানউদ্দিনের পাঁচটি স্থানে ৬ কিলোমিটার, তজুমদ্দিন ও চরফ্যাসনে প্রায় সাড়ে ৪ কিলোমিটার  বাঁধের অর্ধেকের বেশি মাটি মেঘনার জলে ভেসে গেছে। সম্পূর্ণ ছুটে যাওয়া বাঁধগুলো পানি উন্নয় বোর্ড তাৎক্ষণিক সংস্কার করলেও জলোচ্ছ¡াস আটকানোর মতো সক্ষমতা হয়নি। আর নাজুক এসব বাঁধ দিয়ে বড় ধরনের দুর্যোগ মোকাবিলায়ও সম্ভব নয়। তাই ক্ষতিগ্রস্থ বাঁধ দ্রæত সংস্কারের মাধ্যম জোয়ারের পানি থেকে রক্ষার দাবি এলাকাবাসী।   
 বোরহানউদ্দিনের হাসান নগরে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারে শুধু বাঁধের ক্ষতি করেনি নিঃস্ব করে গেছে বেড়িতে আশ্রিত আনেক পরিবারকেও। ঢেউয়ের আঘাতে ভিটির মাটি সরে বিধস্থ ঘরবাড়ি নিয়ে বিপাকে আছেন অনেকে। কেউ কেউ ভয়ে বাঁধের উপর থেকে ঘর সরিয়ে নিচ্ছেন। ¯øইজগেট এলাকার বাসিন্দা ইউসুফ ও রেনু বেগম দম্পত্তির বাঁধের পাড়ের ঘরটি ঢেউয়ের আঘাতে বিধস্থ হয়। অসহায় পরিবারটি গত ৩দিন ভেঙ্গে যাওয়া ঘরের চাল দিয়ে ঝুপড়ি তুলে পাশের  বাঁধের উপর বসবাস  করছেন। ঢেউয়ের আঘাতে ভিটি ভেঙ্গে যাওয়া ঘরটি সরিয়ে নিতে দেখা গেছে মনোয়ারা ও আবুল কালাম দম্পত্তিকে। এমন বিধ্বস্ত অনেক পরিবার জায়গার অভাবে ভাঙা ভিটায় থাকতে বাধ্য হচ্ছে।  তবে পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. হাসানুজ্জামান জানিয়েছেন, ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো আসন্ন্ অমাবস্যার আগেই সংস্কার করা হবে। জোয়ারের পানি যেন ঢুকতে না পারে সেলক্ষ্যে কাজ শুরু করা হয়েছে।
জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ইন্দ্রজিৎ কুমার মন্ডল জানান, শনিবার পর্যন্ত তারা ১৩৪টি পশু মারা যাওয়ার খবর পেয়েছেন। ক্ষয় ক্ষতির তালিকার কাজ চলছে। তবে দক্ষিণের চরগুলোতে নোনা পানির কারণে মহিষের বিভিন্ন অসুখ দেখা দিয়েছে। প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের টিম চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছে। চারনভূতির নস্ট হওয়ায় গরু মহিষ উঁচু স্থানে রেখে খাবার দেয়ার পরার্শ দেন তিনি।
জেলা ত্রাণ ও পূর্ণবাসন কর্মকর্তা মো. মোতাহার হোসেন জানিয়েছেন, যাদের ঘর সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে তাদের জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নগদ টাকা ও ঢেউটিন বরাদ্দ করা হয়েেেছ। শিগগিরই বিতরণ করা হবে। আর পানিব›িদ্বদের মাঝে শুকনো খাবার বিতরণ চলছে।