অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৭শে মাঘ ১৪৩২


মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরে একরাত


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ই জানুয়ারী ২০২৬ রাত ১১:৫৭

remove_red_eye

৭৭

নেয়ামতউল্যাহ : ভোলার মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরগুলো যেন আলাদা এক পৃথিবী। যেখানে মহিষ চরে, রাখফাল ঘুরে বেড়ায়, আর মানুষের যাওয়া-আসা নির্ভর করে নদীর ইচ্ছার ওপর। ইচ্ছে করলেই সেখানে যাওয়া যায় না। সপ্তাহের নির্ধারিত দিনে ট্রলার, নয়তো জেলেদের নৌকা, কিংবা কারও ব্যক্তিগত নৌকা ভরসা। আমারও ১০ নভেম্বর চর বৈরাগীর মহিষ বাথানে যেতে ঠিক এমনই এক অনিশ্চিত যাত্রা করতে হয়েছিল। সেখানে এক রাত কাটানো ছিল আমার জীবনের এক গভীর অভিজ্ঞতা।
বাথান শব্দটা শুনতে সহজ। কিন্তু এর ভেতরের জীবন বড় কঠিন। গবাদিপশুর আবাস, ঘাসের মাঠ, গোশালা সব মিলিয়ে বাথান। আর যারা মহিষ-গরুর দেখভাল করে, তারা বাথানী, রাখাল বা ভোলার ভাষায় রাখফাল। রাখওয়াল থেকে রাখফাল। এই মানুষগুলোর জীবন বিচিত্র, কিন্তু কষ্টে ঠাসা। কাছে গিয়ে না দেখলে তা বোঝা যায় না।
ভোলার সদর উপজেলার তুলাতলী খেয়াঘাট থেকে লাইনের ট্রলারে উঠে নামলাম দৌলতখান উপজেলার মদনপুর ইউনিয়নের মধুপুর চরে। সেখান থেকে ইঞ্জিনচালিত নৌকা। কিন্তু ডুবোচরের অজুহাতে মাঝপথে নামিয়ে দিল দাঁড়টানা এক জেলে নৌকায়। সে নৌকা আবার নামিয়ে দিল ধানখেতে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে বৈরাগীর চরের দিকে রওনা। ধানখেতের মাঝ দিয়ে আঁকাবাঁকা আলপথ, চারদিকে বক, পানকৌড়ি, হটটিটি, নানান জলচর পাখির উড়াল আর ডাক। জেলেরা মাছ ধরছে, মহিষ আর গবাদিপশু দল বেঁধে ঘাসে মুখ গুঁজে আছে। হাঁটতে হাঁটতে বাজারে পৌঁছে একটু খেয়ে আবার হাঁটা। এবার সঙ্গে যোগ দিল দু’জন পথপ্রদর্শক নিজাম ফরাজির নির্দেশে আসা বাথানীরা।
হাঁটু পর্যন্ত গুটানো পাজামা, পিঠে ব্যাগ, এক হাতে জুতো আর মোবাইল, গলায় ক্যামেরা। দেড় ঘণ্টার দুর্গম পথ। নরম কাঁদামাটি, খানাখন্দ, খাল পেরিয়ে এগোনো। পথে দু’এক জায়গায় কলের পানি পেলেও তৃষ্ণা মেটালাম না। ভাবলাম বাথানে গিয়ে খাব। শেষ পর্যন্ত বাথানে গিয়ে নদীর পানিই ভরসা হলো।
পাশে হাঁটছে আবুল হাসেম। বয়স নয়-দশ। মাসিক বেতন নয় হাজার টাকা, খাবারের জন্য দৈনিক দেড়শ। পাঁচ ভাইবোনের সংসারে সে দ্বিতীয়। কেউই পড়াশোনা করে না। মাস শেষে পুরো বেতন তুলে দেয় জেলে বাবার হাতে। আরেক পাশে সাকিব। চৌদ্দ পনেরো বছর বয়স। লক্ষ্মীপুরের কমল নগরের ছেলে। পনেরো হাজার টাকা বেতন পায়। বংশ পরম্পরায় তাদের পরিবার বাথানের সঙ্গে জড়িত।
আমি যে বাথানে যাচ্ছি, সেটি নিজাম হাওলাদারের নামে পরিচিত। একাধিক মালিকের তিন শতাধিক মহিষ এখানে। দুটি বাথান মিলিয়ে এগারো জন বাথানী। আমি যে বাথানে উঠলাম, সেখানে থাকে কচি ছাও (বাচ্চা মহিষ) আর মা মহিষ। পুরুষ মহিষের বাথান নদীর পাশে, সেটি পথে রেখেই এসেছি।
কাঠের সিঁড়ি বেয়ে টিনচালা মাচাঘরে উঠে হাত-পা ধুয়ে খেতে বসি। মাটির সানকিতে ভাত আর চাষের পাঙাশ মাছ। খিদে পেটে অমৃত। কিন্তু পানির কথা মনে হতেই শরীর কেঁপে ওঠে। পেট খারাপ হলে কোথায় যাব? এখানে তো কোনো বাথরুম নেই। খোলা আকাশের নিচে অবারিত মাঠ। সবাই এখানেই মুখ গুজে বসে সারে প্রাকৃতিক কাজ।
গোধূলির আলোয় দূর থেকে বাথানটাকে কালো পাহাড় মনে হয়। চারদিকে নীরবতা। পশ্চিম আকাশে রক্তিম সূর্য ডুবে যাচ্ছে। মাইলের পর মাইল সবুজ ঘাসের ওপর ছড়িয়ে আছে হাজার হাজার মহিষ, গরু, ছাগল, ভেড়া। সুপারি গাছ কেটে জমির চারপাশে ঘের, মাঝখানে বালু-মাটি ফেলে উঁচু কিল্লা। কিল্লার একপাশে মাচাঘর, নিচে ঘেরের ভেতর মহিষের বাচ্চারা। মেয়ে মহিষ ‘মাদাম’, পুরুষ ‘চেলা’, বাছুর ‘ছাও’ পারি ছাও, চেলা ছাও।
সূর্য ডোবার সময় মাদামরা ছাও নিয়ে ফিরতে থাকে। জোড়ায় জোড়ায়। পেছনে রাখফাল। সবার আলাদা আলাদা নাম রাজমালা, নয়নতারা, কাঞ্চন, পাইলট, বন্দুক, শাবানা। নাম ধরে ডাক দিলে মহিষ সাড়া দেয়। কেউ লাইনচ্যুত হলে ধমক ‘ভালা অইবো না কইলাম পাইলট!’
ফিরে এলে বড় মহিষের পায়ে জোড় লাগানো হয়। ছাওদের কিল্লায় তোলা হয় ওরা চায় না, মায়ের দুধ খেতে চায়। তারপর শুরু চিকিৎসা। ঠান্ডাজনিত কাশির জন্য ইনজেকশন। শত শত ছাও, প্রতিদিন। যেসব মাদামের ছাও নেই, তাদেরও ইনজেকশন দুধ চালু রাখতে।
এই চিকিৎসার ওস্তাদ বড় বাথানী মো. বিল্লাল হোসেন। ছয় বছর বয়স থেকে বাথানে। পশ্চিম ইলিশার মানুষ। মাসের মাথায় সন্তানদের দেখতে বাড়ি যান। সব বিদ্যা তাঁর জানা দুধ দোহন, ইনজেকশন, রোগ চিনে ওষুধ দেওয়া, এমনকি নদী সাঁতরানো। রাত নামতে নামতে কাজ শেষ হয়। মহিষের দুধে চা, মাটির সানকিতে মুড়ি। তারপর আবার মহিষ ছাড়ানো রাতভর ঘাস খাবে।
একসময় দেখি অন্ধকারে মহিষ নেই। বিল্লাল টর্চ জ্বালিয়ে দেখে নেয়। সুবজ ফকিরকে ধমক। মহিষ নাকি ধানখেতের দিকে যাচ্ছে। সুবজ গামছা-গেঞ্জি পরে অন্ধকারে হারিয়ে যায়। চরজীবন এমনই সারা রাত পালা করে পাহারা। বর্ষায় জোয়ারে কিল্লা থৈথৈ করে, মহিষ ভেসে যায়, তখন নদীতে নেমে খুঁজতে হয়।
ভোরের আজানে আবার কাজ শুরু। নাম ধরে ডাকলে ছাও বেরোয়, মাকে খুঁজে নেয়। দুধ পান করে, মাদাম আদর করে। দুধ ফেনিয়ে উঠলে দোহন। ইনজেকশন, বড়ি। এক এক করে মহিষ ছাড়ানো হয় মাঠে। সকাল সাড়ে সাতটা, আটটা পেরোয়।
শেষে চা। মহিষের দুধের চা ঘন, স্বরে ভরা। কাঁচা দধি মুড়ির সঙ্গে মাখিয়ে খেলে স্বাদ ভুলবার নয়। নয়টার দিকে আসে ঘোষেরা দুধ কিনতে। দুধের ট্রলারে উঠেই আমার ফেরার যাত্রা।
মেঘনার বুকে এক চর থেকে আরেক চর। মূল নদীতে এসে মনে পড়ে ইতিহাস ভোলা আর নোয়াখালীর মাঝের সেই মেঘনা। পথে হোগলা বন, নতুন বাথান। ফারুক বেপারীর আক্ষেপ জোতদাররা লগ্নি দিয়ে জমি তুলে দিচ্ছে তরমুজ চাষে। মহিষ থাকছে আধপেটা। দুধ কমছে। কষ্ট বাড়ছে।
দুধ পৌঁছে যায় ভোলার নতুনবাজারে, শহরের দধির দোকানে। ভোলার মহিষের কাঁচা দধি আজ জিআই পণ্য। অথচ প্রায় দুই লাখ মহিষের জন্য নেই স্থায়ী চারণভূমি।
বাথানজীবন শুধু পেশা নয়। নদী, চর, মানুষ আর প্রাণীর এক জীবন্ত গল্প। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস, ডাকাতি, অনিশ্চয়তার ভেতরেও এই মানুষগুলো টিকে আছে। যদি সরকারি জমি লগ্নিমুক্ত হয়, উন্নত চেলা মহিষ, চিকিৎসা, নিরাপদ আশ্রয় আর পানির ব্যবস্থা করা যায় তবে এই জীবনকাব্য শুধু টিকে থাকবে না, চরাঞ্চলের মানুষের জীবনেও টেকসই আশার আলো।

মোঃ ইয়ামিন