অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, সোমবার, ৫ই অক্টোবর ২০২৬ | ২০শে আশ্বিন ১৪৩৩


ভোলার পশ্চিমাঞ্চলে তেঁতুলিয়া নদীর ভাঙনের মুখে শতাধিক পরিবার


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৮শে এপ্রিল ২০২৬ সকাল ০৯:২৮

remove_red_eye

৩০৭

সিসি ব্লক ফেলে ভাঙন রোধ ও ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি 


নেয়ামতউল্যাহ : “ভাঙতে ভাঙতে শেষে, বসতঘর আছে বেঁচে। নদীর তীরে বাস, ভাবনা বারোমাস।”
এই কথাগুলো যেন ভোলা সদর উপজেলার তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী মানুষের জীবনেরই প্রতিচ্ছবি। বছরের প্রতিটি দিনই এখানে কাটে অনিশ্চয়তা আর আতঙ্কে। শীতকাল কোনোভাবে পার হলেও বৈশাখ এলেই শুরু হয় দুঃসহ বাস্তবতা, নদীর পানি বাড়ে, ঢেউ তীব্র হয়, আর জীবন হয়ে ওঠে চরম ঝুঁকিপূর্ণ। এমন বাস্তবতার মধ্যেই প্রতিমুহূর্তে আল্লাহর নাম স্মরণ করে দিন কাটাচ্ছেন বিবি রাবেয়া (৩৮)।
রাবেয়ার সংসারে স্বামী মো. মোস্তফা খাঁ, শাশুড়ি ও পাঁচ সন্তান। নদীর এত কাছে বাস করতে ভয় লাগে না—এমন প্রশ্নে রাবেয়ার কণ্ঠে অসহায় স্বীকারোক্তি, “ভয় কইরা কি করুম? যামু কই? থাকনের আর জায়গা থাকলে যাইতাম। এখন রাইত হইলেই মুখ খিচ্ছা, বুক ধইরা থাকি।’
একসময় মোস্তফা খাঁর ছিল ছয় কানি জমি (১ কানি = ১ একর ৬০ শতাংশ)। নদীভাঙনের গ্রাসে একে একে সব জমি হারিয়ে এখন শুধু বসতভিটাটুকুই অবশিষ্ট। সেটুকুও প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে। এমনকি পারিবারিক কবরস্থানেও ধরেছে ভাঙন।
রাবেয়া জানান, শীতকালে নদীর পানি কমে, ঝড়-তুফান থাকে না, ভাঙনও থেমে যায়। কিন্তু বৈশাখের শুরুতেই বদলে যায় চিত্র। জোয়ারে উঠান ডুবে যায়, ঢেউ বাড়ে, ঘরে পানি ঢুকে পড়ে। বড় জলোচ্ছ্বাস হলে আশ্রয় নিতে হয় সাইক্লোন সেল্টারে। এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বসবাস তাদের।
স্বামী মোস্তফা খাঁ মাছ ধরে কোনোমতে সংসার চালান। সারা বছরই মহাজনের দেনা ও এনজিওর ঋণের চাপে জর্জরিত থাকেন। ফলে অন্য কোথাও জমি কিনে নিরাপদে বসবাসের সামর্থ্য তাদের নেই।
রাবেয়া-মোস্তফাদের মতো তেঁতুলিয়া নদীর তীরে ভোলা সদর উপজেলার ভেলুমিয়া ও ভেদুরিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৫০০ পরিবার বসবাস করছে। কিন্তু এসব এলাকায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ না থাকায় প্রতিনিয়ত ভাঙন ও জলোচ্ছ্বাসে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মানুষজন।


ভেদুরিয়া, ভেলুমিয়া ও চর সামাইয়া ইউনিয়নের অংশ নিয়ে গঠিত পশ্চিম ভোলার এই জনপদ এখনো ঝুঁকির মধ্যে। জাঙ্গালিয়া নদীর ওপর তিনটি সেতু নির্মাণ করে মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে সংযুক্ত করা হয়েছে। এখানে নতুন গ্যাসক্ষেত্র, লঞ্চঘাট, বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, টেক্সটাইল কলেজসহ নানা স্থাপনা গড়ে উঠেছে। জনগুরুত্বপূর্ণ এলাকা তবুও চারপাশে কোনো সুরক্ষা বাঁধ না থাকায় প্রতিটি ঘূর্ণিঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের মতে, সিডর, আইলা, রিমালের মতো ঘূর্ণিঝড়ে শতকোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে এই অঞ্চলের।
সম্প্রতি সরেজমিনে ভেলুমিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে-বিস্তীর্ণ ফসলি জমি, পুকুরের মাছ, গবাদিপশু চরছে নদীর তীরে। কিন্তু বছরের প্রায় ছয় মাস (বৈশাখ থেকে আশ্বিন) অমাবস্যা ও পূর্ণিমার জোয়ারে চরাঞ্চল পানিতে ডুবে থাকে। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে ঘরবাড়িতে পানি ওঠে, কাঁচা ঘরের ভিটে ধসে যায়, এমনকি বিদ্যালয়ও প্লাবিত হয়।
চর চন্দ্রপ্রসাদের বাসিন্দা মোসলেহ উদ্দিন শিকদার (৬৭) জানান, শরীফ খাঁ বাড়ি থেকে বিশ্বরোডের মাথা পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার এলাকা এখন ভাঙনকবলিত। গত ২০ বছরে ৫০-৬০ বর্গকিলোমিটার এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বিলীন হয়েছে শতাধিক বাড়ি, যেখানে একসময় একটি বাড়িতে ১০-১২টি পরিবার বসবাস করত।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. রাশেদ খান ও আইয়ুব খান জানান, ইতিমধ্যে তাদের চার কানি জমি নদীতে চলে গেছে। এখন বসতভিটাও হুমকির মুখে। বর্ষায় জোয়ারে উঠান ডুবে যায়, অনেকে ইতোমধ্যে অন্যত্র চলে যেতে বাধ্য হয়েছেন।
বিশ্বরোড এলাকার বাসিন্দা শামসুদ্দিন মাল বলেন, “আমরা আগে কৃষক ছিলাম, এখন জেলে হয়েছি। বাপ-দাদার বাড়ি গেছে, নতুন বাড়িও ভাঙনের মুখে।” তিনি অভিযোগ করেন, সরকার চাইলে বালুভর্তি জিওটেক্সটাইল বস্তা ফেলে ভাঙন প্রতিরোধ করা সম্ভব, কিন্তু কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।
ভেদুরিয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা মঞ্জুরুল আলম বলেন, তেঁতুলিয়া নদী সাধারণত শান্ত থাকলেও দুর্যোগের সময় ভয়ংকর হয়ে ওঠে। তখন সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ কৃষিভিত্তিক অঞ্চলে এখনো কোনো বাঁধ বা তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা নেই।
ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য নুরুল ইসলাম জানান, ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় একমাত্র পাকা সড়কটিও পানির নিচে ডুবে যায়। ফলে যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে পড়ে।
ভেদুরিয়া লঞ্চঘাট এলাকাতেও একই চিত্র। নদীভাঙনে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বিলীন হচ্ছে, গ্যাংওয়ে ও সড়ক হুমকির মুখে। লঞ্চঘাট থেকে দক্ষিণে চটকিমারা খেয়াঘাট পর্যন্ত কয়েক হাত করে নদীভাঙন এগিয়ে আসছে।
এ অবস্থায় ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর দাবি-ক্ষতিপূরণ নয়, দ্রুত নদীতীর সংরক্ষণে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হোক।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বর্ষা মৌসুমে প্রতিটি ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে মানুষ, ফসল, মাছ, গবাদিপশু সবই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জরুরি ভিত্তিতে ভেলুমিয়া ও ভেদুরিয়ার চারপাশে ভাঙন প্রতিরোধ ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ প্রয়োজন।
সম্প্রতি নদীভাঙন প্রতিরোধ, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী এলাকা রক্ষার দাবিতে মানববন্ধন করেছেন এলাকাবাসী। এতে নারী-পুরুষ, শিক্ষার্থীসহ শতাধিক মানুষ অংশ নেন। তারা সিসি ব্লক ফেলে ভাঙন রোধ ও ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, অবৈধ বালু উত্তোলনের কারণে প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা জুড়ে তীব্র ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে। বসতবাড়ি, মসজিদ, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানালেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেয়নি পানি উন্নয়ন বোর্ড।
ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আসফাউদদৌলা জানান, তেঁতুলিয়া নদীর তীর সংরক্ষণে বর্তমানে স্টাডি চলমান রয়েছে। সম্প্রতি একটি বিশেষজ্ঞ দল এলাকা পরিদর্শন করেছে। খুব শিগগিরই সার্ভে সম্পন্ন করে প্রকল্প প্রণয়ন করা হবে এবং অনুমোদন পেলে কাজ শুরু হবে।
এরই মধ্যে প্রতিদিন নদীভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে রাবেয়াদের মতো অসংখ্য পরিবার, যাদের কাছে বেঁচে থাকাটাই এখন সবচেয়ে বড় সংগ্রাম।





লালমোহন উপজেলা ও পৌরসভার ছাত্রদলের কমিটি হওয়ায় আনন্দ মিছিল

লালমোহন উপজেলা ও পৌরসভার ছাত্রদলের কমিটি হওয়ায় আনন্দ মিছিল

লালমোহনে অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত

লালমোহনে অপরাধ প্রতিরোধ বিষয়ক সভা অনুষ্ঠিত

বোরহানউদ্দিনে ১০০ পিস ইয়াবা ও ৪৮,৫০০ টাকা উদ্ধার, মা’দক ব্যবসায়ী আটক

বোরহানউদ্দিনে ১০০ পিস ইয়াবা ও ৪৮,৫০০ টাকা উদ্ধার, মা’দক ব্যবসায়ী আটক

ভোলায় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ

ভোলায় জেলা প্রশাসকের সঙ্গে শানে সাহাবা জাতীয় খতীব ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ

লালমোহন রিপোর্টার্স ইউনিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন

লালমোহন রিপোর্টার্স ইউনিটির পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন

মনপুরায় ইউপি মেম্বারকে পিঠিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেফতার-২

মনপুরায় ইউপি মেম্বারকে পিঠিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে দেওয়ার ঘটনায় মামলা, গ্রেফতার-২

দৌলতখানে পুকুর থেকে প্রতিবন্ধী যুবকের মরদেহ উদ্ধার

দৌলতখানে পুকুর থেকে প্রতিবন্ধী যুবকের মরদেহ উদ্ধার

যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

যানজট নিরসনে বৃত্তাকার সড়ক নির্মাণ কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ প্রধানমন্ত্রীর

গণতন্ত্র একটি সংস্কৃতি যা নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তৈরি হয় : রাষ্ট্রপতি

গণতন্ত্র একটি সংস্কৃতি যা নিয়মিত চর্চার মাধ্যমে ধাপে ধাপে তৈরি হয় : রাষ্ট্রপতি

এশিয়ান গেমসে ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে কমিটি গঠনের নির্দেশ

এশিয়ান গেমসে ব্যর্থতার কারণ খুঁজতে কমিটি গঠনের নির্দেশ

আরও...