অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শনিবার, ৬ই জুন ২০২০ | ২৩শে জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭


একটি ফাউন্টেনপেনের আত্মকাহিনী


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২২শে এপ্রিল ২০২০ রাত ১১:৫৩

remove_red_eye

৩৬

শাহীন কামাল ::
গত প্রায় তিন দশক আমাকে অন্ধকার ঘরে আঁটকে রেখেছেন আমার মালিক। কাল রঙের সেই ঘরে অন্য বেশ কিছু অপ্রয়োজনীয় কাগজ, বই, পত্রিকার সাথে আমাকে বন্ধী করে চিলেকোঠার রেখে দিয়েছেন সে। বছর কয়েক আগে আমার মালিককে দেখেছিলাম। ঘরটিকে খুলে কাগজপত্র নেড়েচেড়ে আবার রেখে দিয়েছেন আটকিয়ে। কেমন অপরিচিত লাগছিল তাকে। আমার মতো সেও বয়সের ভারে ন্যুব্জ হয়ে পরেছে। পরিচিত মানুষটাকে কতো অপরিচিত লেগেছে। অথচ কত আপন ছিলাম আমি তার! কত আনন্দ, বেদনা হাসিকান্নার স্বাক্ষী আমি। মানব সভ্যতার বিকাশে আমাদের ভুমিকা কম নয়। আজকের পৃথিবীর জ্ঞান বিজ্ঞানে এত অগ্রগতি হওয়ার পেছনে রয়েছে আমাদের একনিষ্ঠ ভুমিকা। সেই ৫ হাজার বছর পূর্বে আমাদের পূর্বপুরুষের এই ধরাতে আগমন। তখন অবশ্য আমাদের প্রজাতি এমন ছিল না।গাছের পাতা, প্রস্তর খন্ডে গাছের কষ দিয়ে মানুষ লিখে রাখতো বর্তমানকে ভবিষ্যতের জন্য। কালের বিবর্তনে আমরাও পরিবর্তিত হয়ে আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছি। ৯৫৩ খ্রীস্টাব্দে মিশরের সম্রাট মা'দ আল মুয়িদ নব সংস্করণে আমাদের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন। তখন থেকেই ঝর্ণা কলম বা ফাউন্টেনপেন নামে মানুষের সভ্যতা বিকাশে ওতোপ্রোতোভাবেই আমরা টিকে আছি। ইংরেজি পেন শব্দটি এসেছে ল্যাটিন পেন্না শব্দ থেকে যার অর্থ পাখির পালক। মূলত তখন পাখির পালক কালি জাতীয় কিছুতে ডুবিয়ে লিখা হতো বিধায় এমন নামকরণ করা হয়েছিল। কাঁচের ঘর থেকে এক ভদ্রলোক তার স্কুল পড়ুয়া ছেলের জন্য আমাকে কিনে আনেন। সেদিন থেকে সেই ছাত্রই আমার মালিক। সন্ধাবেলা ছেলের হাতে বাবা যখন আমাকে তুলে দেন, ছেলেটি খুশিতে প্রায় লাফিয়ে উঠেন। তখন সে পেন্সিল দিয়ে লিখতেন। ভুল লেখাগুলোকে পেন্সিলের পেছনের রাবার দিয়ে মুছে ফেলতে পারতেন। তাতে কাগজ ও রাবার উভয়ই ক্ষয়ে যেতো। খয়েরী রঙের চারকোনা প্যাকেটের মধ্য পলিথিনে প্যাচানো আমি। খুলে নিয়েই প্রথমে খাতার উপর মালিক আলতো করে নিজের নাম লিখলেন। চোখেমুখে প্রাপ্তির হাসি স্পষ্ট ছিল তার। ব্লু রঙের পুরো দেহের সাথে সম্মুখে সোনালী রঙের নিব লাগানো। দেহের মাঝ বরাবর প্যাচ খুললে আরও একটা অংশ। এই অংশে ধরে নিব কালির দোয়াতে ডুকিয়ে চাপ দিলেই কালি উঠে শরীরে। এটাই আমার খাদ্য। একবার খেয়ে কয়েকদিন কাজ করতে পারি। সুলেখা আর ইয়ুথ কালির মধ্যে ইয়ুথ ভক্ষণে কাজকর্ম অধিক সুচারু হওয়ার আমার জন্য এটাই পারমানেন্টলি এনে রাখেন আমার মালিক। শরীরের সম্মুখভাগ সোনালী রঙের খাপ দিয়ে ঢাকা। তার সাথে আংটার মতো একটা অংশ। প্রথম রাতেই আমাকে সে নেড়েচেড়ে দেখেন। বিভিন্ন অংশ খুলে আবার জোড়া দেন। সকাল বেলা স্কুলে যাওয়ার সময় গভীর আলিঙ্গনে আমাকে বুক পকেটে রাখেন মালিক। সেই ছোট বুক পকেটে জায়গা না হওয়ায় কাত করে আংটার সাথে শার্টের পকেটে লাগিয়ে রাখেন সত্য কিন্তু বেশ খানিকটা বের হয়ে থাকি। আমি পরে যাওয়ার ভয়ে পুরো পথেই কিছু সময় পর পর হাতের স্পর্শে আমার থাকা নিশ্চিত করেন। বুকের ভেতরের উত্তেজনা টের পাই। পেন্সিল জগৎ থেকে বের হয়ে বড় হয়েছে বুঝতে পেরে ভবিষ্যতের স্বপ্ন বুনে বুকের শব্দগুলো আমি কাছ থেকে শুনি। স্কুলে মালিকের বন্ধুরা এহাত ওহাতে নিয়ে নেড়েচেড়ে দেখে আমায়। হাতে নিয়ে সবাই খাতা বের করে নিজের নাম লিখে। একজন হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ রাখে। আমার মালিক একবার আমাকে দিয়ে দিতে চেয়েছিলেন মনে মনে। দেয়া হয়ে উঠেনি। এভাবেই বেশ চলছিল আমাদের। নিয়মিত, অনিয়মিত লেখা। মন খারাপের সময় আমার নিব দিয়ে অপ্রয়োজনীয় আঁকিবুঁকি। খুশিতে আমার দিয়ে কত রকমের লেখা। হাসিকান্নার কত ইতিহাসের স্বাক্ষী আমি। পরীক্ষা ভাল হলে আমার উপর সদয়, প্রশ্ন কমন না পরলে যেন সব দায় আমার। পরীক্ষার দিনগুলোতে আমার কী কদর! আগ থেকে খাইয়ে গুছিয়ে রাখতেন আমায়। কালি ভরতে গিয়ে মাঝেমধ্যে মজার ঘটনা ঘটতো। নিব দোয়াতে ঢুকিয়ে উঠালে বেশ খানিকটা কালি লেগে থাকতো নিবে। তখন মোছার কিছু না থাকলে খাতার সাথে মোছতেন আমার মালিক। লেখার এক পাতা শেষে পাতা উল্টানোর সময় অবচেতনে আঙ্গুল মুখে গিয়ে খাতার কালি লাগা অংশে যেত। ফলে মাঝেমধ্যে কালির আবছা দাগ দিয়ে ঠোঁটে লাগতো তার। চলতে চলতে আমিও ক্লান্ত, অসুস্থ হয়ে যেতাম। যখন আর লেখা হতো না, মালিক প্রচন্ড রাগে ডান হাত টেবিল থেকে নামিয়ে প্রচন্ড ঝাঁকি দিতেন। ফলে তার বসার ডান পাশের ফ্লোরে কালির লম্বা দাগ নিত্যকার বিষয় হয়ে ছিল। সে দাগ নিয়ে অবশ্য তাকে মাঝেমধ্যে বকা খেতে হয়েছিল। যখন এই ঝাঁকিতে কাজ হতো না তখন বিশেষ চিকিৎসা করা হতো। গরম পানিতে সব অংশগুলোকে খুলে পরিস্কার করতেন। তাতে আমি সুস্থ হয়ে আবার আগের মত কাজ শুরু করতাম। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে রাস্তায় হালকা জলের মধ্য দিয়ে আমার মালিককে ফিরতে হলো। পানিতে নেমে প্যান্ট গুটাতে গেলে টুপ করে আমি তার পকেট থেকে পরে যাই। অনেক খোঁজাখুঁজি করেও সে আমাকে পাননি। তার যে কী মন খারাপ! একদিকে আমাকে হারিয়ে অন্যদিকে আমাকে হারানোর অপরাধে বাড়িতে গিয়ে কেলানি খাওয়ার ভয়ে সে জড়োসড়ো। বিরহ মনে সে বাড়ি ফিরে যায়। পানি কমলে সেই পথে তার বাবা এসে আমাকে আবিষ্কার করে। আমি আবার আমার মালিকের কাছে ফিরে যাই। একদিন সাদাকালো ডোরাকাটা আমার প্রতিপক্ষ চলে আসে বাজারে। তার নাম মনে আছে এখনও। ইকোনো বলপেন। দামে সাশ্রয়ী। দ্রুত লেখে। লেখা শেষ হলেই ছুড়ে ফেলা দেয়া যায়। তাকে পেয়ে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগের স্তপ জমে। আমি অনেক ধীর কাজে, কাগজ একটু খারাপ হলেই নিব দিয়ে কালি ছড়িয়ে পরে, কালি আটকে যায় মাঝে মাঝে, নিউজ পিন্ট কাগজে একদমই লেখা যায় না ইত্যাদি ইত্যাদি। কয়েকদিন অবশ্য কর্মহীন আমাকে রেখে দিয়েছিলেন মালিক টেবিলে। ধীরে ধীরে আমার সেই জায়গাটুকু হারিয়ে যায়৷ আমাকে ছুড়ে ফেলার পরিবর্তে মালিক তার বাবার কিনে দেয়া কালো রঙের ট্রাংকে ভরে রেখে দেয়। তবুও যে ডাস্টবিনে না গিয়ে এই অন্ধকার ঘরে জায়গা হয়েছে, তাও তো স্বান্তনা।




আজকের সাহরীর ও ইফতারে সময় সূচী ভোলা জেলার জন্য