অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শুক্রবার, ২রা জানুয়ারী ২০২৬ | ১৯শে পৌষ ১৪৩২


আধার কাটিয়ে বিদ্যুতে আলোকিত ভোলার দুর্গম ১৯ চরাঞ্চল


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২শে মার্চ ২০২২ রাত ১১:৪৮

remove_red_eye

৪৩১

নাসির লিটন II অন্ধকার কাটিয়ে  বিদ্যুতে আলোয় আলোকিত হয়েছে ভোলার দুর্গম ১৯টি চরের প্রায় ৩৫ হাজার পরিবার । শুধুমাত্র  সাব-মেরিন ক্যাবল পাল্টে দিয়েছে প্রমত্তা মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী চরের বাসিন্দাদের জীবন জীবিকা। জাতীয় গ্রীডের আওতায়  রাজধানী ঢাকা বিভাগী শহর বরিশাল কিংবা জেলা সদর ভোলার মতোই ২৪ ঘন্টা নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাবেন এসব চরাঞ্চলের বাসিন্দারা। এক সময় যেখানে রাতে আধারে ছিলো ধুধু অন্ধকার, সেই  নদীর মাঝে চর গুলোতে  রাতের আধাঁরে জ্বলছে বিদ্যুতের বাতি।

বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপজেলা ভোলাও এখন শতভাগ বিদ্যুতের আওতাভুক্ত। দিনবদলের হাওয়ায় ভাসছে দুর্গম চরের বাসিন্দারা। অচিরেই এর গ্রাহক সংখ্যা ˜িগুন ছাড়িয়ে যাবে বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। আর এ বিদ্যুতে কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে চরাঞ্চলে শুরু হয়েছে নানা উন্নয়ন যজ্ঞ। একদিকে বিছিন্ন এসব চরের মানুষ ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণে অবদান রাখতে পারবে,  অন্যদিকে অর্থনীতির উন্নতির পাশাপাশি অন্ধকার ঘুচিয়ে, জ্ঞান-বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত হবে পিছিয়ে পড়া জনপদের আগামী প্রজন্ম।

নদীর তলদেশ দিয়ে মূল ভূখন্ড থেকে সাব মেরিন ক্যাবলের মাধ্যম জাতীয় গ্রীড লাইন গিয়ে যুক্ত হয়েছে সাগর তীরের চর কুকরী মুকরীর ম্যানগ্রোভ বাগানের পাশের উপকেন্দ্রে। সেখান থেকে সুবজ বাগানের বুক চিরে বিদ্যুতের খাম্বাগুলো চলে গেছে হাট-বাজার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ গ্রাহকের বাড়ি বাড়ি। রাতের অন্ধকার কাটিয়ে বিদ্যুতে আলোকিত হয়েছে দুর্গম এ চর। এমন সংযোগ ওই চরের মানুষের কাছে ছিল স্বপ্নের মতো।


কুকরী মুকরীর মাছ ব্যবসায়ী জাকির হোসেন বলেন, এখানকার সবাই মৎস্যজীবী। মেঘনা ও সাগরে ধরা মাছের ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত ছিলেন তারা। বিদ্যুতায়নের ফলে মাছ সংরক্ষণ এবং আগাম আবহাওয়ার খবর নিশ্চিত করে পাওয়া যাচ্ছে। মাছ বেচা কেনায় প্রতারিত হতে হয় না এখন আর। আগে আমরা ডিজিটাল যোগাযোগের সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিলাম। বিদ্যুৎ পাওয়ায় এখন শহরের মানুষের মতো সব সুবিধাগুলো আমাদের হাতের মুঠোতেই চলে এসেছে।


কুকরী বাজার ব্যবসায়ী মো. আলী জানান, বিদ্যুৎ তাদের কাছে স্বপ্নের মতো। যা ছিল চিন্তার বাইরের বিষয়।  সেই বিদ্যুৎ পেয়ে ভাগ্যের পরিবর্তন করার কাজ শুরু করেছেন তারা। মিল কারখানা স্থাপনের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নিচ্ছেন। কুকরী মুকরীর পর্যটন নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী মো. আনিস হাওলাদার জানান, যেসব কাজ করার চিন্তা করাও যেত না, বিদ্যুৎ পাওয়ার পর এখন তারা সেসব কাজ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করছেন। শুধু মাছ শিকার নয় এখানকার মানুষের বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হবে। বিশেষ করে সাগর কূলের প্রাকৃতিক সৌন্দয্যের সাথে বিদ্যুৎতের সংযোগ নতুন মাত্রা যোগ করেছে যা পর্যটন আকর্ষণে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে।

স্কুল শিক্ষক জাকির মজুমদারের মতে, শিক্ষাখাতে ডিজিটাল কার্যক্রম থেকে কুকরীর শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা বঞ্চিত ছিল। এখন মাল্টিমিডিয়া ক্লাস সহ ডিজিটাল দুনিয়ার সাথে শিক্ষার্থীদের যোগাযোগ সহজ হয়েছে। কুকরী মুকরী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সম্পাদক মো. জাহাঙ্গীর জানান, ব্যবসায়ীয়িরা বরফ কল, লেদ মেশিন সহ স্থানীয় নানা প্রয়োজনীয় মিল কারখানা স্থাপন শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও নতুন নতুন ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হবে। কুকরী এখন আর বিছিন্ন গ্রাম নয় এটি শহরের মতো কুকরী মুকরী হয়েছে শুধু বিদ্যৎতের কারণে।


চরফ্যাসনের দক্ষিণ পশ্চিম ও পটুয়াখালী জেলার দশমিনা, গলাচিপা লাগোয়া ইউনিয়ন মুজিব নগর। তেঁতুলিয়া ও বুড়াগৌরঙ্গ নদীতে বিছিন্ন মুজিব নগর এখন আলোকিত জনপদের নাম। মুবিজ নগরের বাসিন্দা বিউটি বেগম বলেছেন, দূর্গম এবং বিচ্ছিন্ন এই চর জীবনে ডিস সংযোগ, ফ্রিজ এবং টিভি চালোনার কথা ৫ বছর আগেও কেউ ভাবেনি। চিন্তসীমার বাহিরের বিষয়গুলো এখন বাস্তব। চরে বসে মানুষ শহরের সুবিধা ভোগ করছে। রাতে আলোজ্বলমল গ্রামের বাড়িগুলোকে দেখে মনে হচ্ছে-এ যেন কোন শহর। চর মোতাহারের কৃষক হারুন পাটোয়ারী জানান, বাপ দাদার কাছ থেকে শেখা পদ্ধতিতে আমরা কৃষি কাজ করে আসছি। বিদ্যুৎ পাওয়ার পর আমার ডিজিটাল মাধ্যমে আধুনিক চাষাবাদ শিখে অনেক উপকৃত হচ্ছি। ইউটিউবে দেখে এবার পরিত্যক্ত জমিতে আগাম তরমুজ চাষ করে বাম্পার ফলন পেয়েছেন হারুন পাটোয়ারী।


সাব মেরিন ক্যাবেলের মাধ্যমে পাওয়া বিদ্যুৎ অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে উন্নয়ন ও আলোর পথে এগিয়ে চলছে বলে মনে করেন এসব চরের জনপ্রতিনিধি ও সচেতন মহল। কুকরী-মুকরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন বলেছেন, কুকরীতে বিদ্যুতায়িত হওয়ায় এখানকার পর্যটন শিল্পে বৈপ্লবীক পরিবর্তনের হাওয়া লেগেছে। প্রত্যন্ত এবং দূর্গম এসব গ্রামগুলোর ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ থাকায় এখানে বিদ্যুৎ নির্ভর কৃষি কাজের বিকাশ শুরু হয়েছে। বিশেষ করে কৃষিপণ্য উৎপাদন, হাস-মুরগী ও গবাদি পশুর খামার এবং তথ্যপ্রবাহ নির্বিঘœ হয়েছে। প্রত্যন্ত গ্রামে বসবাস করেও দূর্গম এলাকার মানুষ শহরের আধুনিক জীবন-মানের সুবিধা পেতে শুরু করেছে। মুজবি নগর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল ওয়াদুদ জানান, ২/৩ মাসে বিদ্যুৎতের ছোয়ায় যে পরিবর্তন এসেছে তা শতবছরেও হয়নি। চরে ছোট ছোট বাজারে টিভি ফ্রিজ বেচা কেনা হচ্ছে। সামান্য আয়ের মানুষ ঘরে ফ্রিজ তুলছেন। এ যেন দুর্গম চরে শহরের সুবিধা।

তজুমদ্দিন উপজেলার চর মোজাম্মলের হোটেল ব্যবসায়ী মো. রফিক জানান, নি¤œ আয় ও দরিদ্র মানুষের বসাবাস এ চরে। মেঘনায় মাছ ধরে দিন এনে দিন খায় অবস্থা এদের। সেই অশিক্ষিত ও দরিদ্র মানুষরাও এখন বিদ্যুৎ ব্যবহার করছেন। যা চরের বাসিন্দাদের চিন্তার বাইরে ছিল। কয়েক মাস হলো বিদ্যুৎ এসেছে এতেই শহরের অনেক কিছু অনুকরণ শুরু করেছে দুর্গম চরের বাসিন্দারা।
জেলা সদর থেকে মাত্র ১০ কিলোমিটার দুরে মেঘনার মধ্যে কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝের চর। কয়েক দশক আগে জেগে ওঠা এ চরে নদী ভাঙনে নিঃস্ব মানুষের বসবাস। গেল ডিসেম্বর মাসে সাব মেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যু আসে এ চরে। এর আগে এখানকার মানুষের অবস্থা ছিল অনেকটা প্রদীপের নিচে অন্ধকারের মতো। তারা ঘরে বসে নদীর ওপার বিজলী বাতির আলো দেখলেও নিজের ঘরে জ্বালাতে পারবে এনম স্বপ্ন কখনও দেখেন নি। কিন্তু  সেই বিজলী বাতি সেই মাঝের চরের ঘরে ঘরে জ্বলছে। মাঝের চরের প্রবীণ নাগরিক আলী আকবর বলেন, এ বিদ্যুৎ আমাদের জীবনে শুধু ঘরে আলো দিলেও আমাদের পরবর্তী প্রজম্মের জীবন আলোকিত করবে। বিদ্যুতকে কাজে লাগিয়ে চির চেনা অভাব অনটন দুর করে হাসি ফিরিয়ে আনবে এমন আশা এ প্রবীণের।

ভোলা পল্লীবিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আলতাপ হোসেন জানান, ৪শ’ ৬৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ভোলার জেলার ১৩টি চর সহ উপকূলের ১৯টি চরের ৩৪ হাজার ৮৪২ জন গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া হয়েছে। এসব গ্রাহক জাতীয় গ্রীডের আওতাভুক্ত। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া মধ্যবর্তী এসব চরে  সাব মেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। গেল বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এসব সংযোগের কাজ  শেষ হয়। সোমবার প্রধানমন্ত্রী এর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সারাদেশের মতো দ্বীপজেলা ভোলাও এখন শতভাগ বিদ্যুতের আওতাভুক্ত।

তিনি আরও জানান, ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী ১৩টি চরে জাতীয় গ্রীডের আওতায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। চরগুলো হচ্ছে সদর উপজেলার ভেদুরিয়া ইউনিয়নের তেঁতুলিয়া নদীর মধ্যবর্তী  চর চটকিমারা, কাচিয়া ইউনিয়নের মেঘনা নদীর মাঝের চর, দৌলতখান উপজেলার মদনপুর, হাজিরপুর, মেদুয়া, ভবানিপুর, তজুমদ্দিনের চর মোজাম্মেল, চর জহির উদ্দিন চরফ্যাসনের চর কুকরী মুকরী, ঢালচর, চর নিজাম, মুজিব নগর ও লালমোহনের চর কচুয়া। এ ১৩টি চরে বর্তমানে ১৩ হাজার ৭০৭ জন গ্রাহক রয়েছে। একই প্রকল্পের আওতায় পটুয়াখালী ও ল²ীপুর জেলার আরও ৬টি চরে বিদ্যুৎ এখান থেকেই সরবরাহ হয়ে থাকে।  


আলতাপ হোসেন বলেন, এ বিদ্যুতের মাধ্যমে বিছিন্ন চরের মানুষের জীবন মানে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধুনিকতার ছোয়া লাগতে শুরু করেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে নতুন নতুন ব্যবসা বাণিজ্য ও ছোট ছোট মিল কারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। বিছিন্ন জনপদের মানুষ দ্রæত অর্থনীতির উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের লেখা পড়ায়ও ডিজিটাল ছোয়া লাগতে শুরু করেছে। পল্লী বিদ্যুৎ জেলায় শীত মৌসুমে ৫০ মেগায়াট ও গরমের সময় ৭৫ মেঘাওয়াট বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে। 





ভোলায় কোস্টগার্ডের অভিযানে ২টি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোট ও জালসহ ২০ জেলে আটক

ভোলায় কোস্টগার্ডের অভিযানে ২টি অবৈধ আর্টিসানাল ট্রলিং বোট ও জালসহ ২০ জেলে আটক

ভোলা-২ আসনে সংসদ নির্বাচনের যাচাই বাছাইয়ে সতন্ত্র দুই প্রার্থী মনোনয়ন বাতিল, বৈধ -৭

ভোলা-২ আসনে সংসদ নির্বাচনের যাচাই বাছাইয়ে সতন্ত্র দুই প্রার্থী মনোনয়ন বাতিল, বৈধ -৭

ভোলায় বেড়েছে শীতের প্রকোপ মৃদু শৈত প্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত

ভোলায় বেড়েছে শীতের প্রকোপ মৃদু শৈত প্রবাহে জনজীবন বিপর্যস্ত

ভোলায় বছরের প্রথম দিনে নতুন বই পেয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দ উৎসব

ভোলায় বছরের প্রথম দিনে নতুন বই পেয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে আনন্দ উৎসব

মনপুরায় পুলিশের অভিযানে আটক-১

মনপুরায় পুলিশের অভিযানে আটক-১

পুরো বাংলাদেশই আমার পরিবার হয়ে উঠেছে: তারেক রহমান

পুরো বাংলাদেশই আমার পরিবার হয়ে উঠেছে: তারেক রহমান

ভোলাসহ ১৭ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ, তাপমাত্রা বাড়তে পারে ২ ডিগ্রি পর্যন্ত

ভোলাসহ ১৭ জেলায় শৈত্যপ্রবাহ, তাপমাত্রা বাড়তে পারে ২ ডিগ্রি পর্যন্ত

নির্বাচনে দেশের পক্ষের শক্তি বিএনপিকে বিজয়ী করবে: মির্জা ফখরুল

নির্বাচনে দেশের পক্ষের শক্তি বিএনপিকে বিজয়ী করবে: মির্জা ফখরুল

র‍্যাবকে রাজনৈতিকভাবে এক ঘণ্টার জন্যও ব্যবহার করিনি: বাবর

র‍্যাবকে রাজনৈতিকভাবে এক ঘণ্টার জন্যও ব্যবহার করিনি: বাবর

ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ কার্যকর, শাস্তি বাড়ল কয়েকগুণ

ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ কার্যকর, শাস্তি বাড়ল কয়েকগুণ

আরও...