অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শুক্রবার, ১৮ই জুন ২০২১ | ৪ঠা আষাঢ় ১৪২৮


ভোলার চর পাতিলায় থৈ থৈ পানি, জীবন বাঁচাতে পানির অভাব


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৭শে মে ২০২১ রাত ১১:০৯

remove_red_eye

১৪৭



সাগরকূলের ২ ইউনিয়নে  ক্ষতিগ্রস্থ ৫শ’ পরিবার

নাসির লিটন, চর পাতিলা থেকে : ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে গত দুই দিন  ৫ থেকে ৬ফুট পানিতে তলিয়ে আছে সাগর কূলের ইউনিয়ন চর কুকরী কুমরির চরপাতিলা। ঢেউয়ের আঘাতে গৃহহীন হয়েছে শতাধিক পরিবার। আংশিক ক্ষতিগ্রস্থ আরও তিনশ। পানির জন্য ঘর থেকে বের হতে পারছে না চরবাসী। জোয়ারের সময় পুরো চরে এক টুকরা মাটিও শুকনো পাওয়া যায় নি। তারপরও পানির জন্য হাহাকার। বৃহস্পতিবার দুপুরে ঝড়ে বিধস্ত ঘরভিটা থেকে প্রায় দেড় কিলোমিটার গলাপানি ভেঙ্গে খাবার পানি সংগ্রহ করতে দেখা যায় ৬০ বছরের বৃদ্ধা রোসনা বিবিকে। মেঘনার তীব্র স্্েরাতে সাথে লড়াই করে এক কলস বিশুদ্ধ পানি নিয়ে নিজ ঘরে ফেরার প্রাণপন চেস্টা তার। জোয়ারের পানির ¯্রােতের সাথে যুদ্ধের তার সঙ্গী নাতনি তারা ও মীম।
প্লাবিত এলাবার ক্ষয়-ক্ষতি পরির্দনে গিয়ে কলসভর্তি পানি নিয়ে ¯্রােতের সাথে বৃদ্ধার এমন লড়াই দৃস্টি কাড়ে গণমাধ্যম কর্মীদের। জানতে চাইলে রোসনা বিবি বলেন, গাঙের পানি মাথার ছাউনি, পেডের ভাত বেবাক কাইড়া নিছে। বাকী আছে জানডা (জীবনটা)। এইডা বাচানের লাইগ্যা এই যুদ্ধ। চারদিকে পানি থৈ থৈ করে। পারা দেওনের ( পা রাখার) মাডি (মাটি) পাইনা পানির লাইগ্যা কিন্তু হেই পানি মুাহে দিতে পারি না নুনের লাইগ্যা। পেডে গেলে কলেরা শুরু হয়। ভাত না খাইয়া ২/১দিন থাওন যায়। কিন্তু পানি না খাওয়া তো থাওন যায় না।
 
চর কুকরী মুকরি ইউনিয়নের দক্ষিণ চর পাতিলা গ্রামে হাসেম হাওলাদারের স্ত্রী রোসনা বিবি। তিনি জানান, মঙ্গলবার রাতের জোয়ারে মালামাল সহ ঘরটি মেঘনায় ভেসে গেছে। এরপর থেকে স্বামী-স্ত্রীর ঠিকানা হয় ছেলে নিজাম হাওলাদারের ঘরে। বুধবার নিজামের ঘরের ভিটিসহ একাংশ জোয়ারে ভেসে গেছে। ভিটাবিহীন ঘরে মাচা করে থাকছেন তারা সবাই। প্রতিদিনি দুইবারে ১২ ঘন্টা গাঙের পানিতে তলিয়ে থাকে পুরো এলাকা। নিজাম ছাড়াও রোসনা বিবির আরও ৫ ছেলে বারেক হাওলাদার, বাদশা, বশির, কাদের ও কাজল একই এলাকায় বসবসাস করেন। সবার ঘরের মাটি জোয়ারে ভেসে গেছে। পানিতে তলিয়ে আছে তিন দিন। খাল, বিল সব নোনা পানিতে তলিয়ে থাকায় খাবার পানির চরম সংকট দেখা দিয়েছে। বৃহস্পতিবার বেলা ১১ টায় প্রায় দেড় কিলোমিটার পথ পাড়ি দেয়ে নলকূপ থেকে বিশুদ্ধ পানি আনতে যান রোসনা। ফেরার সময় মেঘনার জোয়ারে সব তলিয়ে যায়। দুই নাতনিকে নিয়ে ¯্রােতের সাথে লড়াইকে এক কলসি পানি নিয়ে আসেন বাড়িতে। তিনি আরও জানান, চেয়ারম্যানের দেয়া বিস্কুট ও চিড়া খেয়ে সকাল কাটিয়েছেন। বিকালে কি হবে জানা নাই তার। সব তলিয়ে থাকায় কোথাও যেতেও পারছেন না। কিভাবে নতুন করে ঘর তুলবেন জানা নেই রোসনার।
   
চর পাতিলার প্রায় ৫ হাজার মানুষ জোয়ার ভাটায় প্লাবিত হচ্ছে। একদিন আগে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাব কেটে গেলেও দুর্ভোগ কমার পরিবর্তে আরও বেড়েছে।  কুকরীর চেয়ে পাশ্ববর্তী ঢালচরের অবস্থা আরও খারাপ। এই দ্ইু ইউনিয়নে সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে ২ শতাধিক ঘরবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। ঘরবাড়ির ক্ষতি হয়নি এমন পরিবার নেই চর পাতিলা আর ঢালচরে। গৃহহারা অনেকের আশ্রয় হয়েছে স্থানীয় বাজার ও অন্যের বাড়িতে। স্থানীয় তথ্যানুযায়ী কুকরী মুকরী ও ঢালচরে প্রায় ৫ পরিবার কমবেশি হয়েছে।
 
সরেজমিনে দেখা যায়, বুধবার ঘুর্ণিঝড় ইয়াস এর প্রভাবে  উত্তাল সাগরের ঢেউয়ের আঘাতে তছনছ করা ঘর নাম সর্বস্ব দাড়িয়ে আছে। স্রোতে ভিটির মাটির সাথে ভাসিয়ে নিয়েছে আসবাবপত্র।  মাটিছাড়া ভিটি ও বেড়া ছাড়া খুটির উপর দাড়িয়ে থাকা ঘরগুলো এখন বসবাসের অনুপযোগি। বসতঘরে মাচা করে দিন কাটাচ্ছে চরবাসী। নোনা পানিতে সব তলিয়ে থাকায় বিশুদ্ধ পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। তছনছ করে রেখে যাওয়া এসব ঘরবাড়ি বৃহস্পতিবার দুপুরে আবারও ৬ফুট পানিতে তলিয়ে যায়। এভাবে গত ২ দিন জোয়ারে ভাসছে পাতিলা ও ঢালচরের ১০ হাজার মানুষ। চর পাতিলার চেয়ে ভয়াবহ অবস্থা সাগর কূলের ঢালচরের। বাজারের ৬০টি মাছের আড়ত আর শতাধিক বসত ঘর বিধস্থ হয়েছে। দুর্গম এই ২ চরে ক্ষতি হয়নি এমন কোন পরিবার নেই। শুকনো জায়গার অভাবে গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে পরেছে। মাথার উপরের ছাউনি হারা দূর্গতদের ভোগান্তির শেষ নাই। স্থানীয় চেয়ারম্যান কিছু শুকনো খাবার দিলেও তার প্রয়োজনের তুলনায় কিছুই না। ঝড়ের পরে বৃস্টি অব্যহত থাকায় বেড়েছে সবর্স্বহারা মানুষগুলোর দুর্ভোগ। গতকাল দুপুরে পূর্ব পাতিলা বাজার এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, শিশু সন্তানদের নিয়ে ২০ থেকে ২৫ জন গৃহীনি খালের পাড়ে বসে আছে।  তারা জানান, গত ২ দিনের ওই এলাকার খালেক মাঝির ঘরসহ ৩টি ঘর জোয়ারে ভেসে গেছে। জাহাঙ্গীর, আলাউদ্দিন, অম্বিয়া, নেছার, কাদের, হেজু মাঝির টিনের ঘর বিধ্বস্ত অবস্থায় পরে আছে। এসব ঘর থেকে কোন মালামালই সরানো সম্ভব হয় নি। তাই ওইসব ঘরের বাসিন্দারা নিরুপায় হয়ে বাজারে আশ্রয় নিয়েছেন।
কুকরী মুকরী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল হাসেন মহাজান জানিয়েছেন, পুরো কুকরী মুকরীতে চার শতাধিক পরিবার চরম সংকটে পরেছে। তিনি ব্যক্তিগত তহবিল থেকে বেশি দুর্গতদের কিছু সহায়তা করেছেন। আর উপজেলা প্রশাসন গতকাল বিকালে দেড়শ পরিবারকে শুকনো খাবার দিয়েছে। দুর্গত মানুষদের পূর্ণবাসনে বড় সহায়তা দরকার। তা না হলে এসব মানুষের পক্ষে ঘুরে দাড়ানো সম্ভব না। এছাড়া প্লাবন থেকে রক্ষায় চর পাতিলার চার পাশে উচুরাস্তা নির্মাণ করা প্রয়োজন। শুধু ঘরবাড়ি না, ঘেরের ২ কোটি টাকার মাছ ভেসে গেছে। গবাদি পশুর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে যা দরিদ্র কৃষকদের জন্য বড় সমস্যা হবে।
ঢালচরের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম হাওলাদার জানিয়েছেন, তার ইউনিয়নের ক্ষতি হয়নি এমন কোন পরিবার নেই। জোয়ারের জন্য ক্ষয় ক্ষতির তালিকাও করা যাচ্ছে না। প্রাথমিকভাবে ৬০ মাছের আড়ত ও শতাধিক ঘর বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পেয়েছেন। ঢালচর কুকরী মুকরীর মতোই জেলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার মধ্যবর্তী চরাঞ্চলেও অনেক ঘরের ক্ষতি হয়েছে বলে জানা গেছে।

তবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের আঘাতে ক্ষয়ক্ষতির নিরুপনের কাজ শেষ হয় নি। চরফ্যাসন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. রুহুল আমিন জানান, চর পাতিলায় বৃহস্পতিবার বিকালে দেড়শ পরিবারকে শুকনো খাবার দেয়া হয়েছে। তালিকা প্রণয়ন শেষ হলে ক্ষতিগ্রস্থদের ত্রাণের পাশাপাশি গৃহনির্মাণ সামগ্রী দেয়া হবে।