অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, সোমবার, ২৪শে আগস্ট ২০২৬ | ৯ই ভাদ্র ১৪৩৩


চিকিৎসক ও সরঞ্জাম সংকটে চরফ্যাশন হাসপাতাল


চরফ্যাসন প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২৩শে আগস্ট ২০২৬ রাত ১০:০৪

remove_red_eye

৬৫

৫২ জন মেডিকেল অফিসারের পদে রয়েছে মাত্র ১৭ জন ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা


এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন থেকে :  ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় প্রায় ৭ লাখ মানুষের চিকিৎসাসেবার এক মাত্র প্রধান ভরসা চরফ্যাশন উপজেলার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। তবে প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, কনসালট্যান্ট, বিভিন্ন পদে জনবল, রেডিওগ্রাফার ও আধুনিক ল্যাব সুবিধার সংকটে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসাসেবা। হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও নেই রেডিওগ্রাফার। নেই আধুনিক মানের পূর্ণাঙ্গ ল্যাব সুবিধা। এমনকি রক্তের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সিবিসি করার প্রয়োজনীয় মেশিনও নেই। ফলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য রোগীদের ছুটতে হচ্ছে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, অবকাঠামোগতভাবে হাসপাতালটি ১০০ শয্যায় উন্নীত করা হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন না থাকায় এখনো পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম চালু হয়নি। চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকটের কারণে বিপুলসংখ্যক রোগীকে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসাসেবা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে ৬৬ জন চিকিৎসকের পদ থাকলেও কর্মরত আছেন মাত্র ২১ জন। এর মধ্যে ১০ জন কনসালট্যান্টের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। ৫২ জন মেডিকেল অফিসারের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৭ জন। ৩০ জন নার্সের বিপরীতে রয়েছেন ২৮ জন। ১৬ জন সেকমো পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন। ৫ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীর বিপরীতে রয়েছেন ২ জন। ৩ জন ল্যাব অ্যাসিস্ট্যান্টের বিপরীতে কর্মরত আছেন ২ জন। এছাড়া ৩ জন ফার্মাসিস্টের পদ থাকলেও বর্তমানে কোনো ফার্মাসিস্ট নেই।
এদিকে চিকিৎসাসেবায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরও রয়েছে সংকট। শিশু, গাইনি ও হৃদরোগের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিভাগে চিকিৎসক না থাকায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য অন্যত্র যেতে হচ্ছে। বিশেষ করে নারী ও শিশু রোগীদের জন্য ভোগান্তি আরও বেশি। হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীদেরও নিয়মিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাসেবা পেতে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।
চিকিৎসা সরঞ্জামের সংকটও প্রকট। হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন থাকলেও সেটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় রেডিওগ্রাফার নেই। ফলে দুর্ঘটনায় আহতসহ বিভিন্ন রোগীর এক্স-রে করাতে অনেক সময় হাসপাতালের বাইরে যেতে হচ্ছে। এতে রোগীদের বাড়তি অর্থ ব্যয়ের পাশাপাশি সময়ও নষ্ট হচ্ছে। জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে দ্রুত পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা সম্ভব না হওয়ায় চিকিৎসা ব্যবস্থাপনাতেও জটিলতা তৈরি হচ্ছে।
এদিকে হাসপাতালটিতে নেই আধুনিক মানের পূর্ণাঙ্গ ল্যাব সুবিধা। প্রয়োজনীয় আধুনিক যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনকি রক্তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা সিবিসি করার জন্যও প্রয়োজনীয় মেশিন নেই। ফলে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে হচ্ছে।
রোগী ও তাদের স্বজনরা জানান, সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ না থাকায় বাধ্য হয়ে বাইরে পরীক্ষা করাতে হয়। চরফ্যাশন উপজেলা বড় হওয়ায় এখানকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি আশপাশের এলাকার মানুষও এই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসেন। ফলে চিকিৎসক ও পরীক্ষা-নিরীক্ষার সংকটের কারণে রোগীদের দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
হৃদরোগে আক্রান্ত মো. রতন বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগে আক্রান্ত। হঠাৎ অসুস্থ হলে এই হাসপাতালে আসতে হয়। কিন্তু নিয়মিত হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক না থাকায় সপ্তাহে শুক্রবার যে ডাক্তার আসেন, তার ওপরই নির্ভর করতে হয়। জরুরি সময়ে এভাবে চিকিৎসা পাওয়া খুবই কঠিন।’
হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী আইয়ুব বলেন, ‘আমাদের এই হাসপাতালে বিশেষ করে একজন শিশু বিশেষজ্ঞ ও একজন গাইনি চিকিৎসক অত্যন্ত প্রয়োজন। চরফ্যাশন একটি বড় উপজেলা। পাশের উপজেলার লোকজনও এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন। অথচ এক্স-রে থেকে শুরু করে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা হাসপাতালের বাইরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে করতে হয়। এতে আমাদের বাড়তি টাকা খরচ হয়।’
হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার ডা. মাকলুকুর রহমান বলেন, ‘হাসপাতালে এক্স-রে মেশিন রয়েছে, কিন্তু রেডিওগ্রাফার না থাকায় পূর্ণাঙ্গ সেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আধুনিক ল্যাব ও প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার যন্ত্রপাতিরও ঘাটতি রয়েছে। সিবিসি করার মেশিনও নেই। এসব বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশরাফুল ইসলাম সুমন বলেন, ‘হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা উন্নত করতে প্রয়োজনীয় জনবল ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। চিকিৎসক, নার্সসহ বিভিন্ন পদে জনবল সংকট রয়েছে। পাশাপাশি এক্স-রে সেবা চালু রাখতে রেডিওগ্রাফার এবং আধুনিক ল্যাব পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির প্রয়োজন রয়েছে। এসব সংকট সমাধান হলে রোগীদের চিকিৎসাসেবার মান আরও উন্নত হবে।





আরও...