অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বৃহঃস্পতিবার, ৩০শে এপ্রিল ২০২৬ | ১৭ই বৈশাখ ১৪৩৩


দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা শেষ হচ্ছে ভোলায় তেলের সংকটে নদীতে নামতে পারছেন না জেলেরা


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০শে এপ্রিল ২০২৬ রাত ০৯:২৪

remove_red_eye

৩৬

সরকারি ভর্তুকিতে জ্বালানি তেল সরবরাহের দাবী

নেয়ামত উল্যাহ : ‘তেল পাইলে নদীত যামু, নাইলে নাই, নাইলে হেই দেনা করি দিন চালাইতো অইবো।’-বৃহস্পতিবার সকালে কথাগুলো বলেন ভোলার সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ রাজাপুর গ্রামের জেলে ইউসুফ মাঝি (৫৪)। তাঁর মতো অনেক জেলেরই দাবি, জেলেদের মধ্যে সরকারি ভর্তুকিতে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হোক!

ইলিশের জাটকা সংরক্ষণ অভিযান শেষে আজ (বৃহস্পতিবার) দিবাগত রাত ১২টার পর থেকে মেঘনা-তেতুলিয়াসহ দেশের পাঁচটি অভয়াশ্রমে মাছ ধরা শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু মাছ ধরা শুরু হলেও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি ও সংকটের কারণে অধিকাংশ জেলে এখনো ঘাটেই বসে আছেন। ইউসুফ মাঝির নৌকায় ছয়জন ভাগী (মাঝিমাল্লা) রয়েছেন। কোনো রকম সাহায্য না পেয়ে গত দুই মাস তাঁদের মানবেতর অবস্থায় দিন কাটাতে হয়েছে।
দুই মাস (মার্চ-এপ্রিল) ভোলার নদীগুলোতে অভয়াশ্রম সৃষ্টির লক্ষ্যে জাল ফেলা নিষিদ্ধ ছিল। এ সময় জেলার ১৯০ কিলোমিটার নদীতে মাছ শিকার বন্ধ রাখা হয়। গত দুই যুগ ধরে এ কার্যক্রম চালু রয়েছে।
এতে জেলেদের মধ্যে সচেতনতা বাড়লেও অভাব দূর হয়নি। মহাজনের দাদন, এনজিওর কিস্তি ও দারিদ্র্যের চাপে অনেক জেলে আইন উপেক্ষা করে জাটকাসহ ছোট মাছ শিকার করেছেন-এমন অভিযোগ রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, এ ধরনের জেলের সংখ্যা খুবই কম; প্রায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ জেলে নিষেধাজ্ঞা মেনে ডাঙায় থেকে কষ্টে দিন পার করেছেন।
জেলেরা আরও বলেন,  ঋণের সঙ্গে  যোগ হয়েছে জ্বালানী তেল সঙকটসহ দাম বৃদ্ধি। 


রাজাপুরের জেলে আবুল কালাম মাঝি (৪৫) জানান, নিষেধাজ্ঞার শুরুতেই তিনি জাল-নৌকা গুছিয়ে তীরে উঠেছেন। তাঁর নৌকায় ১৪ জন মাঝিমাল্লা থাকলেও মাত্র দুজন জেলেকার্ডধারী। তাঁরা ৪০ কেজি করে মোট ৮০ কেজি চাল পেয়েছেন, যেখানে পাওয়ার কথা ছিল ১৬০ কেজি করে মোট ৩২০ কেজি। নিষেধাজ্ঞার সময়ে দিনমজুরি করে কোনো রকমে সংসার চালালেও মাছ ধরতে যাননি। এখন নিষেধাজ্ঞা শেষ হলেও তেলের উচ্চমূল্য ও সংকটের কারণে নদীতে নামতে পারছেন না।
তিনি বলেন, “এখন চাইলেই নদীতে নামা যাচ্ছে না। দোকানদার নগদ টাকা ছাড়া তেল দিচ্ছে না, আবার চাহিদামতো তেলও পাওয়া যাচ্ছে না।”
সদর উপজেলার ইলিশা ইউনিয়নের চডারমাথা মাছঘাটের মৎস্য আড়তদার শাহাবুদ্দিন ফরাজি বলেন, দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ থাকার পর জেলেরা এখন ঋণ শোধের আশায় নদীতে নামতে চাইলেও জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় তা সম্ভব হচ্ছে না। আগাম নগদ টাকা দিলেই কেবল তেল পাওয়া যাচ্ছে, তাও লিটারপ্রতি ১৬০-১৮০ টাকা দরে। এতে অনেক জেলের পক্ষেই তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “জেলেদের জীবন পুরোপুরি দেনায় জর্জরিত। টাকা নাই, তেল নাই—নদীতে নামবে কীভাবে?”
লালমোহন উপজেলার বাত্তিরখাল মাছঘাটে জেলে মামুন মাঝি ও মৎস্য আড়তদার মো. ঝিকু জানান, জেলেরা জাল-নৌকা নামিয়ে প্রস্তুতি নিচ্ছেন। আলকাতরা দিয়ে নৌকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। তবে তেল কিনতে পারলে শুক্রবার নদীতে নামার আশা করছেন তারা। বাত্তিরখালে চার লিটার ডিজেলের দাম ৭০০ টাকা হলেও সেটিও সহজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁদের দাবি—সরকারের উচিত জেলেদের জন্য ন্যায্যমূল্যে তেলের ব্যবস্থা করা।
চরফ্যাশন উপজেলার ঢালচরের মৎস্য আড়তদার শাহে আলম ফরাজি বলেন, “টাকা দিয়েও তেল পাওয়া যাচ্ছে না। তেল পেলেই জেলেরা নদীতে নামবে।”
ভোলার মৎস্য কার্যালয় সূত্র জানায়, ইলিশের নিরাপদ প্রজনন ও জাটকা সংরক্ষণের জন্য জেলার চারপাশের ১৯০ কিলোমিটার জলসীমাকে অভয়াশ্রম ঘোষণা করা হয়েছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে ২২ দিনের প্রজনন মৌসুমে ৪৯.২৭ শতাংশ মা-ইলিশ নদীতে ডিম ছেড়েছে। সেই ডিম থেকে উৎপন্ন পোনা মার্চ-এপ্রিল নাগাদ ১২-১৬ সেন্টিমিটার আকার ধারণ করে। এই জাটকাগুলোকে সাগরে পৌঁছে বড় হওয়ার সুযোগ দিতে দুই মাস মাছ ধরা বন্ধ রাখা হয়।
১ মার্চ রাত ১২টা থেকে ৩০ এপ্রিল রাত ১২টা পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বলবৎ ছিল। এ সময় মাছ ধরা, ক্রয়-বিক্রয় ও মজুদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। মেঘনা নদীর ইলিশা থেকে চর পিয়াল পর্যন্ত ৯০ কিলোমিটার এবং তেতুলিয়া নদীর ভেদুরিয়া থেকে চর রুস্তম পর্যন্ত ১০০ কিলোমিটার এলাকাসহ মোট ১৯০ কিলোমিটার এই অভয়াশ্রমের আওতায় রয়েছে।
এ দুই মাসে ভোলার সাত উপজেলার প্রায় আড়াই লাখ জেলে বেকার হয়ে পড়েন। জেলার নিবন্ধিত ১ লাখ ৫৯ হাজার জেলের মধ্যে ৯০ হাজার ২০০ জন হতদরিদ্র জেলেকে চার মাসে ৪০ কেজি করে মোট ১২০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২৪ হাজার অতিদরিদ্র জেলেকে তেল, আটা, চিনি, লবণ, ডাল ও আলুসহ খাদ্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে, যার বিতরণ প্রক্রিয়া এখনো চলমান।
সদর উপজেলা ক্ষুদ্র মৎস্যজীবী ও জেলে সমিতির সভাপতি এরশাদ আলীসহ একাধিক জেলে বলেন, বাজারে তেলের দাম যাই হোক, জেলেদের নদীর পাড়ে ১০-২০ টাকা বেশি দিয়ে এক লিটার ডিজেল কিনতে হচ্ছে।  তাই সরকারের উচিত জেলেদের কমপক্ষে ন্যায্যমূল্যে দেওয়া। আর ভর্তূকি দিলেতো খুবই উপকার হয়। 


সদর উপজেলার জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, দীর্ঘ দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা অভিযান শেষে জেলেরা নদীতে নামবে। এ সময় জ্বালানী তেলের সংকট, কিম্বা দাম বেশি হলে সেটি দুঃখজনক। তবে তাঁর মতে ডিজেলের সংকট নেই। তবে জেলেরা যে ভর্তুকির দাবি করেছে, সে বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে পারবেন না, এক সময় মৎস্যখামারীরা কোনো ভর্তূকি পেতো না, দাবির প্রেক্ষিতে ২০ শতাংশ কমিশন বা ভর্তূকি পাচ্ছে। হয়তো সরকার চাইলে জেলেরাও পাবে।  

জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসাইন জানান, স্বল্প জনবল ও সীমিত বাজেট নিয়েও তাঁরা নিয়মিত অভিযান ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেছেন। গত দুই মাসে ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত ৪৫০টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে এবং আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

ভোলা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. বেলাল হোসেন বলেন, “ভোলায় তেলের কোনো সংকট নেই। তারপরও জেলেরা যাতে তেল পায়, সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”