অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, সোমবার, ৯ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২৭শে মাঘ ১৪৩২


তারুয়া দ্বীপে মায়াবী হাতছানি : পর্যটন সুবিধা পেলে বদলে যেতে পারে দক্ষিণের অর্থনৈতিক চিত্র


চরফ্যাসন প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ২০শে জানুয়ারী ২০২৬ দুপুর ০২:৫৭

remove_red_eye

৮৫

এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন : চরফ্যাশন উপজেলার সাগর মোহনার ঢালচরের দক্ষিণে অবস্থিত ছোট্ট দ্বীপ তারুয়া বঙ্গোপসাগরে কোলে প্রায় চার দশক আগে জেগে ওঠা দ্বীপটি প্রকৃতির সুনিপুণ নিখুঁত এক সৃষ্টি। সবুজ বনভূমি,সোনালি সৈকত পাড়ে বালুর ঝলকানি, লাল কাঁকড়া বিচরণ সব মিলিয়ে এ দ্বীপটি যেনো প্রকৃতির এক অনন্য উপহার।
যথাযথ প্রচার এবং পর্যটনের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এটি দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনৈতিক চিত্র বদলে দিতে পারে।


জানা গেছে, তারুয়া দ্বীপটিতে পৌঁছাতে হলে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ যাত্রাপথ। ভোলা জেলা সদর থেকে প্রায় ১৩৫ কিলোমিটার সড়কপথ এবং এরপর ১৫ কিলোমিটার নদীপথ পাড়ি দিয়ে তারুয়া দ্বীপের মোহনীয় রূপ চোখে পড়ে। দ্বীপের পথে যাত্রায় ক্লান্তি ভুলিয়ে দেয় সাগরের গর্জন, চারদিকে বিস্তৃত নীল জলরাশি, আর সবুজে ঘেরা দ্বীপের মোহণীয় দৃশ্য। মনে হয় প্রকৃতিকে যেন ভিন্ন রূপে সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে গড়েছেন করেছেন। প্রায় কিলোমিটার দীর্ঘ এ তারুয়া সমুদ্র সৈকতের একপাশে বঙ্গোপসাগর আর অন্যপাশে বিস্তৃর্ণ চারণভূমি, যার শেষ হয়েছে তারুয়া সৈকতসংলগ্ন ম্যানগ্রোভ বনে। হরিণ, বন্য মহিষ, বানর, লাল কাঁকড়াসহ বিভিন্ন প্রাণীর বসবাস এ দ্বীপে প্রকৃতির নিখাদ নির্জনতা এবং মোহনীয়তা যেসব মানুষকে আন্দোলিত করে, নতুন করে বেঁচে থাকার উদ্দীপনা জোগায় তার সব উপকরণই তারুয়া সমুদ্র সৈকতে দৃশ্যমাণ। প্রকৃতি যেন নিজ হাতে এ সাজিয়েছে, আপন ভঙ্গিমায। তারুয়া দ্বীপের অন্যতম আকর্ষণ সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত । সকালের চরফ্যাশন উপজেলার সাগর মোহনার ঢালচরের দক্ষিণে অবস্থিত তারুয়া দ্বীপের চরে ঘাস খাচ্ছে মহিষের দল সোনালি আভায় উদ্ভাসিত সূর্য যখ সাগরের বুক থেকে উকি দেয়, তখন তা এক স্বপ্নীল দৃশ্যের অবতারণা ঘটিয়ে মন ও মননশীলতাকে উদ্ভাসিত করে তোলে। আবার যখন সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসে পশ্চিম আকাশ রক্তিম আভায় রাঙা হয়ে ওঠে, তখ যেন পুলকিত মনের গহিনে অন্যরকম এক অনুভূতির সঞ্চার হয়। জানা গেছে, প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ বছর আগে বঙ্গোপসাগরের বুক চিরে জেগে উঠে সবুজের এ ঢালচর এলাকা। স্থানীয়রা যখন এ এলাকায় মাছ ধরতে আসতেন তখন শত শত তারুয়া নামের এক প্রকার মাছ উঠে আসত তাদের জালে। ধারণা করা হয় সে কারণেই এ এলাকাটির নামকরণ করা হয়েছে তারুয়া, যা এখন সবার কাছে তারুয়া সমুদ্র সৈকত নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে। দ্বীপটি জীববৈচিত্র্যের এক অপূর্বক্ষেত্র। এখানে রয়েছে নানা প্রজাতির বৃক্ষরাজি, হরিণ,কাঠবিড়ালী, বন বিড়াল এবং শীতকালীন হরেক প্রজাতির অতিথি পাখি। শীতের সকালে দূরদেশ থেকে আসা পাখিদের কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো তারুয়া দ্বীপ। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তারুয়া দ্বীপে স্থায়ী বসতি এখনো উল্লেখযোগ্য হারে গড়ে ওঠেনি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পর্যটকদের সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

এ দ্বীপে পর্যটন সম্ভাবন অপরিসীম। পর্যটকদের ওয়াটার অ্যাডভেঞ্চার, ক্যাম্পিং সুবিধা এবং পরিবেশবান্ধব রিসোর্ট গড়ে তোলা হলে এটি কক্সবাজার কিংবা কুয়াকাটার মতো আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রের মতো আকর্ষণীয় স্পটে পরিণত হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন যথাযথ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং অবকাঠামোগত উন্নয়ন। সড়কপথে সরাসরি যোগাযোগ ও সি-ট্রাক
পরিষেবা চালু করা গেলে এখানে ভ্রমণ আরো সহজতর হবে বলে আগতরা মনে করেন। তারুয়া দ্বীপ শুধু সৌন্দর্যের নয়, সম্ভাবনারও এক বিশাল ক্ষেত্র। সাগরের ঢেউ আর সবুজের মাঝে লুকিয়ে থাকা এ দ্বীপ বাংলাদেশের পর্যটন শিল্পে এক নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা ও উদ্যোগের মাধ্যমে তারুয়াকে দেশের পর্যটন মানচিত্রে উজ্জ্বল এক অনন্য স্থানে পরিণত
করা সম্ভব। পর্যটন সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, এখন সময় এসেছে তারুয়া দ্বীপকে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটনকেন্দ্রে রূপান্তরিত করার। প্রকৃতির অমূল্য এ রত্নকে পর্যটকদের স্বর্গরাজ্যে পরিণত করতে পারলে এটি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের এক নতুন দিগন্তের দ্বার উন্মোচন করবে।
ঢালচর ইউনিয়ন বিট কর্মকর্তা নাসিম খুশবু  বলেন, তারুয়া বিচের সৌন্দর্য ও পাখির অভয়ারণ্য রক্ষায় পর্যটকদের সচেতন থাকার পাশাপাশি ক্যাম্পিং করার সময় অবশ্যই বন পরিবেশের যেন ক্ষতি না হয় বিষয়টি মাথায় রাখা উচিত। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলে পরিযায়ী পাখিদের আগমন শুরু হয়েছে। ঘুরতে এসে বনের মধ্যে আতশবাজি ফোটানো ও রাতে ফায়ারিং (আগুন জ্বালানো) নিষিদ্ধ। পরিবেশের ক্ষতি সাধন ও পাখিদের কেউ যাতে শিকার করতে না পারে সেজন্য বন বিভাগের আটটি রেঞ্জ থেকে টহল জোরদার করা হয়েছে।


মোঃ ইয়ামিন