অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শনিবার, ৩০শে মে ২০২০ | ১৬ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭


করোনায় সম্মুখ সারির যোদ্ধা সংবাদ কর্মীদের খবর কেউ রাখে?


জসিম জনি

প্রকাশিত: ৯ই মে ২০২০ রাত ০৮:১৯

remove_red_eye

১৭৬

মো. জসিম জনি:: করোনার প্রকোপ থেকে বাঁচতে সবাই যখন ঘরে, তখন পেশার দায়বোধ নিয়ে ঠিকই কাজ করে যাচ্ছেন সংবাদকর্মীরা। চিকিৎসক, পুলিশ, প্রশাসনের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে, সংবাদ প্রকাশ-প্রচারে অগ্রগামী সংবাদশ্রমিকরাও। মাঠে কাজ করতে গিয়ে আক্রান্ত যেমন হয়েছেন, মৃত্যুর তালিকায়ও আছেন সাংবাদিক। কোনো ঝুঁকিভাতা কিংবা প্রণোদনা ছাড়াই, স্রেফ পেশার প্রতি ভালোবাসা থেকেই চলছে কলম-ক্যামেরা-কীবোর্ড। আজ কতোজন আক্রান্ত হলেন, মারা গেলেন কতোজন? ছুটিইবা বাড়লো কদ্দিন? এমন সব প্রশ্নে, এক রিমোটেই জানছেন উত্তর। কিংবা চোখ বুলিয়ে নিচ্ছেন পত্রিকা আর অনলাইন পোর্টালে। চিকিৎসক পুলিশের সাথে সমানতালে নিজেদের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সংবাদশ্রমিকরা। মাঠে ঘাটে কাজ করতে গিয়ে এ পর্যন্ত করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন দেশের প্রায় ৮০ জন সাংবাদিক। তবুও দায়িত্বে ছেদ পড়েনি এতোটুকুও। সম্মুখ সারির যোদ্ধা হিসাবে সাংবাদিকদের কি কোনো প্রনোদোনা আছে। উত্তর নেতিবাচক। অবশ্য সংবাদকর্মীরা তার আশায় বসেও নেই। কলম-ক্যামেরা-কিবোর্ড চলছে আপন গতিতে।


যতই দিন যাচ্ছে ততই যেনো প্রকৃত গণমাধ্যমকর্মীরা অবহেলার পাত্রে পরিণত হচ্ছেন। সংবাদপত্র বা গণমাধ্যমকে রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ বলা হয়। কিন্তু বাস্তবে এ স্তম্ভের মর্যাদা আদৌ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রকৃত চিত্র এমন যে, গণমাধ্যম কর্মীরা যেনো আজ এক ধরনের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যের পাত্রে পরিণত হয়েছেন। গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য যে রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা থাকার কথা সেটা নেই বললেই চলে। সাংবাদিকদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দাবী এখনো অপূর্ণই রয়ে গেলো। কখনো সাংবাদিকরা নিরাপত্তার সুযোগ ভোগ করতে পারেনি। ক্ষেত্র বিশেষ যে নাগরিক অধিকার পাওয়ার কথা একজন সংবাদকর্মীর, তাও আজ উপেক্ষিত।

করোনাভাইরাসের মহামারিতে সন্ত্রস্ত পুরো বিশ্ব। করোনাভাইরাসের সংক্রমণে বিশ্ব যখন রীতিমতো ভীত-সন্ত্রস্ত, তখন জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন সংবাদমাধ্যমের কর্মীরা। ঘরবন্দি মানুষের কাছে পৃথিবীর প্রতিটি কোনে ঘটনা তুলে ধরার জন্য ছুটে বেড়ানো সংবাদমাধ্যমের কর্মীদেরও ‘ছাড়’ দেয়নি প্রাণঘাতী ভাইরাস। গত ১ মার্চ থেকে ১ মে পর্যন্ত বিশ্বের ২৩টি দেশে ৫৫ জন সাংবাদিক করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গিয়েছেন। দ্য প্রেস এমব্লেম ক্যাম্পেইন (পিইসি) নামে এক আন্তর্জাতিক সংগঠন এ কথা জানিয়েছে। করোনায় বলি বিশ্বের ২৩টি দেশের ৫৫ জন সাংবাদিকের তালিকা প্রকাশ করে সংগঠনের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে, করোনার মতো অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগের সংবাদ সংগ্রহ করতে যাওয়া সাংবাদিকদের অধিকাংশেরই কোনও সুরক্ষা সরঞ্জাম ছিল না।

সারা বিশ্বে শুধুমাত্র ৫৫ জন সাংবাদিক যে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন, তাই নয়। আরও কয়েকশ’ সংবাদমাধ্যম কর্মী মারণ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তালিকায় বাংলাদেশি সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকন, পাকিস্তানি সাংবাদিক জাফর ভাট্টির নামও রয়েছে।

গত ২৮ এপ্রিল মারা গিয়েছিলেন জাফর ভাট্টি আর পরের দিন ২৯ এপ্রিল মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েছিলেন বাংলাদেশের পরিচিত সাংবাদিক হুমায়ুন কবীর খোকন। দৈনিক সময়ের আলোর পত্রিকার সিটি এডিটর ও প্রধান প্রতিবেদক ছিলেন হুমায়ুন কবীর খোকন। এরই মধ্যে বাংলাদেশে আরো দুইজন মারা গেছে করোনার উপসর্গ নিয়ে। ৭ মে রাতে প্রচ- জ্বরের কারণে ভোরের কাগজের স্টাফ রিপোর্টার ও বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্রাব) সাবেক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক আসলাম রহমান মারা গেছেন। ২৮ এপ্রিল থেকে আসলাম অসুস্থ ছিলেন। বেশ কয়েকবার শ্বাসকষ্ট অনুভূত হলে তিনি তার করোনা টেস্ট করান। তবে তার করোনা নেগেটিভ আসে। এর আগে ৫ মে করোনাভাইরাসের উপসর্গ নিয়ে  সময়ের আলোর আরেকজন সাংবাদিক মাহমুদুল হাকিম অপুর মৃত্যু হয়। তিনি পত্রিকাটিতে সাব-এডিটর হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ওই দিন সেহরির জন্য ঘুম থেকে ডাকতে গেলে তাকে মৃত অবস্থায় পান তার স্ত্রী।

বাংলাদেশের কয়েকটি টেলিভিশনের সাংবাদিকও করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন বলে খবর বেরিয়েছে। এক সময়ের বহুল প্রচারিত পত্রিকা দৈনিক ইত্তেফাকের সাতজন সংবাদকর্মী প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। শুক্রবার (৮ মে) পত্রিকাটির কম্পিউটার সেকশনের পাঁচজন কর্মীর কোভিড-১৯ পজিটিভ আসে। এর আগে আরও দুজন আক্রান্ত হয়েছেন। পত্রিকাটির এক সিনিয়র সাংবাদিক বিষয়টি নিশ্চিত করেন।

এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ৮০ জনের মতো সংবাদকর্মী করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। সুস্থ হয়েছেন ১৩ জন সংবাদ কর্মী। করোনার সঙ্গে যুদ্ধ করে এ পর্যন্ত সুস্থ হওয়া সংবাদকর্মীরা হলেন- ইন্ডিপেন্ডেন্ট টিভির একজন ক্যামেরাপারসন, যমুনা টিভির একজন রিপোর্টার এবং নরসিংদী প্রতিনিধি, দীপ্ত টিভির একজন, এটিএন নিউজের একজন রিপোর্টার, একাত্তর টিভির গাজীপুর প্রতিনিধি, বাংলাদেশের খবরের একজন রিপোর্টার, দৈনিক সংগ্রামের একজন, নারায়ণগঞ্জের শীতলক্ষ্যা পত্রিকার সম্পাদক, ভোরের কাগজের বামনা উপজেলা (বরগুনা) প্রতিনিধি, দৈনিক প্রথম আলোর একজন, দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশের কাপাসিয়া (গাজীপুর) প্রতিনিধি এবং দৈনিক জনতার একজন।
সরকারি কর্মকর্তা- কর্মচারীদের জন্য ইতোমধ্যে প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। করোনা ভাইরাসের এই সংকটকালীন সময় দায়িত্ব পালনকালে চিকিৎসক, স্বাস্থ্যকর্মী, প্রশাসন-পুলিশ ও প্রজাতন্ত্রের অন্য কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রয়োজনমতো ঝুঁকি ভাতা পাবেন। করোনায় আক্রান্ত হয়ে কোনো দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীর মৃত্যু হলে তার পরিবার পদমর্যাদা অনুসারে এককালীন বিশেষ অর্থ সহায়তা পাবেন। থাকবে বিমার ব্যবস্থাও। এরকম একগুচ্ছ সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য। এই মহতি প্রণোদনার ঘোষণা এসেছে খোদ দেশের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে। এটা সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। প্রশংসনীয় কাজ। অবশ্যই সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য এই প্রণোদনার ঘোষণা। এতে অনেকের মধ্যে দায়িত্বপালনের ভীতি কাটবে। ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতাও বাড়বে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রের আনুকূল্য পাবেন এটা অস্বাভাবিক নয়। এটা একটা স্বাভাবিক পাওয়া। সাংবাদিক সমাজ এ প্রণোদনার ঘোষণাকে অবশ্যই সাদুবাদ জানায়। কিন্তু সাংবাদিক কিংবা গণমাধ্যমের সাথে জড়িত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য করোনা পরিস্থিতিতে কোন ধরনের সুযোগ সুবিধা নেই। নেই প্রণোদনা। নেই তাদের পেশাগত নিরাপত্তা। সাংবাদিকদের জন্য নেই আর্থিক, সামাজিক, নিরাপত্তা। মানুষের কাছে দেশের বিদেশের সর্বশেষ খবর তৈরি করে পাঠক  শ্রোতাদের কাছে দ্রুত পৌঁছে দেন যে মিডিয়া কর্মী তাদের খবর কেউ রাখেনা। সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরেন যে সাংবাদিক তাদের বৈষম্য যেন কেউ দেখেনা। দেশের ক্রান্তিকালে মেধা মননে সাংবাদিক প্রয়োজন। প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে গণমাধ্যম কর্মীদের আর কেউ খোঁজ নেয়ার প্রয়োজনও মনে করেনা। কাজ শেষে সাংবাদিকদের সবাই ভুলে যায়। এদের পরিবার কীভাবে চলে কেউ খোঁজ খবর নেয়না। সমাজের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মতো কষ্টকে বুকে চেপে ধরে জীবন যাপন করেন অধিকাংশ সাংবাদিক। সুনাম ও সুখ্যাতি দিয়েতো আর সংসার চলেনা। বাজারের খরচ আসেনা। সন্তানের লেখা পড়ার খরচ যোগার হয়না এ সুনাম জস খ্যাতি দিয়ে। সাংবাদিকরা আজীবন নেশারঘোরে সমাজকে দিয়েই যায়, বিনীময়ে খুব কমই পায়। তবে এ দুর্যোগে তথ্য প্রকাশ ও প্রচারে গণমাধ্যমকর্মীদের জন্য পর্যাপ্ত স্বাস্থ্য নিরাপত্তা এবং পেশাগত সুরক্ষা ও নিয়মিত বেতন-ভাতার পাশাপাশি আপৎকালীন প্রণোদনা নিশ্চিত করতে মালিকপক্ষ ও সরকারের কাছে আহ্বান জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। 

দেশে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ভয়াবহভাবে বিস্তার ঘটায় সংবাদপত্র, টেলিভিশন, ডিজিটাল নিউজ পেপার, বার্তা সংস্থার সাংবাদিক কর্মচারীদের কর্তব্য পালন হুমকির মুখে পড়েছে। এ কথাও কারো আজানা নয়, বেশিরভাগ গণমাধ্যমে বেতন-ভাতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সুবিধাদি অনিয়মিত। স্বাস্থ্যঝুঁকির কোন ধরনের নিরাপত্তা নেই। নেই, পরিবহণ সুবিধাও। তারপরেও, পাঠক চাহিদা, প্রতিষ্ঠানের সুনাম অক্ষুন্ন রাখা এবং রাষ্ট্রের চতুর্থস্তম্ব হিসেবে পেশাগত দায়িত্ববোধ থেকে সংবাদ কর্মীরা কর্তব্য পালন করে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান নাজুক পরিস্থিতিতে সংবাদকর্মীদের জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠান ও রাষ্ট্রকে নতুন করে জরুরিভাবে চিন্তা করতে হবে।




আজকের সাহরীর ও ইফতারে সময় সূচী ভোলা জেলার জন্য



আরও...