ভোলা, বুধবার, ১লা এপ্রিল ২০২০ | ১৭ই চৈত্র ১৪২৬

বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক


১৫ই মার্চ ২০২০ রাত ১০:৪৯




পাবলিক পরীক্ষার যেকোনো ফলাফল মেনে নিতে তৈরি থাকতে হবে

শিক্ষা



শাহীন কামাল :

পাবলিক পরীক্ষায় জিপিএ ৫ এর পরিবর্তে জিপিএ ৪ এর হিসেবে ফলাফল প্রকাশিত হলে বহু কাঙ্খিত এ প্লাসের সংখ্যা একেবারেই কমে যাবে, যা শতকরা হিসেবে ক্ষেত্রবিশেষে ১ কিংবা তারও নিচে নেমে যেতে পারে। এবছরের জেএসসি ও সমমান থেকে এ নতুন মানদÐে ফলাফল প্রকাশের বিষয়ে সংশ্লিষ্টমহল নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিকে এ পদ্ধতি শুরু হবে আগামী বছর থেকে। গ্রেডিং বন্টনে নুন্যতম পাশ মার্ক ৩৩ ঠিক রেখে সর্বোচ্চ ৯০ থেকে ১০০ পর্যন্ত জিপিএ ৪ বা এ প্লাস নির্ধারণ করেছেন। পূর্বে সর্বোচ্চ জিপিএ ছিল ৫। কোন শিক্ষার্থী ৮০ পেলেই সর্বোচ্চ গ্রেড পেতো। তখন পাবলিক পরীক্ষায় বড় সংখ্যক ছেলেমেয়েরা জিপিএ ৫ এর আওতায় আসতো। কোন কোন পরীক্ষায় তা লাখেরও অধিক হতো। কিন্তু নতুন পদ্ধতিতে সামান্য সংখ্যক জিপিএ ৪ বা এ প্লাস পাবে তা নিয়ে সরকার, শিক্ষাবোর্ড, সংশ্লিষ্ট দফতর, শিক্ষক, অভিভাবক কিংবা সচেতন মহল সন্তুষ্ট থাকবে কিনা তা দেখার বিষয়। যদি এই এ প্লাসের প্রত্যাশা পূর্ববর্তী বছরের সাথে তুলনা করে সেই লক্ষ্যে যেতে চায় তবে পরীক্ষা ও উত্তরপত্র মূল্যায়নে অবস্থা পূর্বাপেক্ষা অবনতি ঘটবে তা সহজেই অনুমেয়।

গ্রেডিং পদ্ধতির এই পরিবর্তন আনয়নে অন্যতম যুক্তি উচ্চ শিক্ষার সাথে তাল মিলানো এবং আন্তর্জাতিক বিশ্বের সাথে সংগতি রাখা। ভাবনাটি অত্যন্ত কার্যকর ও সময়োপযোগী। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অবশ্য নূন্যতম পাশ মার্ক ৪০। এই মানদÐ আমাদের পাবলিক পরীক্ষায় ধরে রাখতে হলে ফলাফল হবে হতাশাব্যাঞ্জক। ফলে পাশ মার্ক ৩৩ রেখে কর্তৃপক্ষ সেই অবস্থান থেকে রক্ষা করেছে। কিন্তু শুধুমাত্র জিপিএর পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক বিশ্বে টিকে থাকা সম্ভব নয়। দরকার মানসম্মত শিক্ষা। দরকার শ্রেণি কক্ষে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি। মানসম্মত পরীক্ষার অভাব আর উত্তরপত্র মূল্যায়নে শৈথিল্য কাগুজে তাল মিলানো হিসেবেই চিহ্নিত থাকবে , কার্যত কোন পরিবর্তন আসবে না।  

২০০১ সালে জিপিএ পদ্ধতিতে প্রথম ফলাফল প্রকাশিত হলে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় সর্বোচ্চ সূচকে পৌছে ৭৬ শিক্ষার্থী। ২০০৩ এর উচ্চমাধ্যমিকে এই শিক্ষার্থীরাই জিপিএ ৫ প্রাপ্ত হয় ২০ জন। সেই সংখ্যা প্রতিবছর লক্ষ্যনীয়ভাবে বৃদ্ধি পায়। ২০১৯ সালে এসএসসিতে জিপিএ ৫ এর সংখ্যা ৯৪ হাজার ৫৫৬ তে পৌঁছে। একই বছর অর্থাৎ ২০১৯ এ এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ ৫ পেয়েছিল ৪৭ হাজার ২৮৬ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর ৩.৫৪ শতাংশ। সংখ্যার দিকে যা বিগত বছরের চেয়ে ১৮ হাজার ২৪ জন বেশি। ২০১৮ তে এইচএসসি ও সমমান পরীক্ষায় এই সংখ্যা ছিল ২৯ হাজার ২৬২।
বিগত কয়েক বছরে জিপিএ ৫ এর সহজলভ্যতার কারণে জিপিএ ৫ সকলের একমাত্র লক্ষ্যে পরিনত হয়েছে। সবাইকে এ প্লাস পাওয়ার লক্ষ্যে অভিভাবক যেমন সন্তানের স্বাভাবিক জীবনকে ব্যহত করেছে, তেমনি অনৈতিক প্রক্রিয়া গ্রহণে ক্ষেত্রবিশেষে কেউ কেউ পিছপা হয়নি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো গন এ প্লাসের জন্য নানা ফন্দিফিকির করেছে। ইচ্ছামত পরীক্ষা নেয়ার জন্য কেন্দ্র স্থাপন করেছে কেউ কেউ। একই শ্রেণীতে সকল শিক্ষার্থী যে সর্বোচ্চ মানের থাকে না, তা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল সকলেই। জিপিএ ৫ পাওয়ার এই ঘোড়া দৌড়ে শামিল হয়েছিল শিক্ষক , অভিভাবক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমনকি দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানও। এ কর্ম সাধন করতে পরীক্ষার হল নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, তেমনি উত্তর পত্র মূল্যায়নেও। ফলে সকল বিষয়ে ৮০ এর বেশি নাম্বার পাওয়া কেউ কেউ ' আই এম জিপিএ ৫ ' হিসেবে নিন্দিত হয়েছে।        

  উত্তরপত্র যথাযথ মূল্যয়ন মানসম্মত শিক্ষার অন্যতম শর্ত। এক্ষেত্রে ব্যর্থ হলে শ্রেনীকক্ষে পাঠদান ও পাঠগ্রহণ কার্যকর পর্যায়ে পৌঁছবে না। প্রতিবছর পাবলিক পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশের পর ব্যাপক সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন উত্তরপত্র মূল্যায়ন বিষয়ের প্রশ্নকে সামনে নিয়ে আসে। সদ্য প্রকাশিত প্রাইমারি ও এবতেদায়ি সমাপনী পরীক্ষায় ফলাফল পরিবর্তন হয়েছে ২৭ হাজার ২০৯ শিক্ষার্থীদের। ২০১৯ সালের এসএসসিতে ৪৩১২ জন শিক্ষার্থীর ফলাফল পরিবর্তন হয়েছে। নতুন করে ৬৪৭ জন পরীক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছিল আর অকৃতকার্য থেকে কৃতকার্য হয়েছিল ৬১৯ জন। ২০১৯ সালের এইচএসসিতে ১০ বোর্ডে নতুন জিপিএ ৫ পেয়েছিল ২৬৬ জন আর ফলাফল পরিবর্তনের সংখ্যা ব্যাপক। এটা শুধু একদিকের চিত্র। বিপরীতের দৃশ্য নিয়ে আলোচনা হয়না সত্য কিন্তু পর্যালোচনা করলে তা হবে আরো ভয়াবহ যা অন্ধকারে থেকে যাচ্ছে বছরের পর বছর। উত্তরপত্র মূল্যায়নে পরীক্ষকদের দায়ী করা হলেও এর অন্তরালে নানাবিধ কারন রয়েছে। উত্তরপত্র মূল্যায়নে সময়ের সল্পতা, স্বল্প পারিতোষিক, অভিজ্ঞ শিক্ষকদের অনীহা এবং শিক্ষাবোর্ডগুলোর প্রচ্ছন্ন হস্তক্ষেপও যথাযথ ফলাফল প্রাপ্তিতে অন্তরায়। পরীক্ষা পদ্ধতির সাথে উত্তরপত্র মূল্যায়ন বিষয়ে যৌক্তিক ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত জরুরি।     
ফলাফল পরবর্তীতে প্রায় প্রতিবছর কোন কোন শিক্ষার্থীর আত্মাহুতি আমাদের ব্যথিত করে। প্রত্যাশিত ফলাফলে ব্যার্থ হয়ে শিক্ষার্থীদের এহেন বেদনাদায়ক কর্মকান্ডের সাথে পারিপার্শ্বিক তুলনাও দায়ী। নতুন পদ্ধতিতে এ প্লাস সহ সকল জিপিএ প্রাপ্তি পূর্বাপেক্ষা অবনতি হবে, এ বিষয়ে শিক্ষার্থীসহ সকলের মানষিক দৃঢ়তা জরুরি।        
বেডু (বাংলাদেশ এডুকেশন ডেভেলপমেন্ট ইউনিট) পরীক্ষা ব্যবস্থার এসকল অসংগতি অনুধাবন করে বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত করছে, কিন্তু পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে এর কোন প্রভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বিষয়ভিত্তিক পরীক্ষকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এ বিভাগ পাবলিক পরীক্ষার ফলাফলে বিদ্যমান নানা অসংগতি দূরীকরণে আরো বেশি সচেষ্ট হতে হবে।
যেনতেন ভাবে ফলাফল করার অবারিত সুযোগ শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতি সাধন করছে। শিক্ষার্থীদের প্রতিষ্ঠানবিমুখ হওয়া তথা পাঠ বিমুখ হওয়া দৃশ্যমান। পাঠ্যপুস্তক বাদে নোট গাইড আর কোচিং নির্ভর হয়ে পরেছে শিক্ষার্থীরা। বিগত কয়েক বছরে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ব্যপকভাবে বৃদ্ধি পেলেও মান নিয়ে শংকা দেখা দিয়েছে। একটা সময় অল্প কিছু সংখ্যক ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করলেও তারা সকলেই পড়ত সত্যিকার অর্থেই। এখন অনেকই পড়ে, কিন্তু সত্যিকারের পড়ুয়া শিক্ষার্থী কমে যাচ্ছে। শহর অঞ্চলে পারিবারিক চাপ কিংবা পারিপার্শ্বিক অবস্থায় শিক্ষার্থীরা পড়ামুখি হলেও গ্রামাঞ্চলের পরিস্থিতি ভয়াবহ।          
একটা নতুন ব্যবস্থা শুরু করতে প্রাথমিকভাবে কিছু সমস্যা দেখা দিবে৷ পাবলিক পরীক্ষার  ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও নানা সমস্যা দৃশ্যমান হবে। কিন্তু এ সকল সমস্যা সমাধানে শিক্ষার মানের সাথে আপোষ করলে সকল প্রচেষ্টাই জলে যাবে। ইদানীং কালে শিক্ষার মান নিয়ে কথা উঠছে জোড়ালোভাবে। এ অভিযোগ থেকে বের হতে হলে ফলাফল বিষয়ে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে হবে। যাহা ৮০ তাহাই ৯০ ভাবলে কিংবা ভাবাতে বাধ্য করলে শিক্ষার মানের আরো অবনতি রোধ সম্ভব হবে না।

লেখকঃ শিক্ষক, সাংবাদিক।