অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, রবিবার, ২২শে মে ২০২২ | ৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪২৯


পরিবারের এক মাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে নির্বাক জেলে আমির হোসেনের বাবা- মা ও স্ত্রী


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ই এপ্রিল ২০২২ ভোর ০৪:২৩

remove_red_eye

৩২

 "আমাগো ঘরে ৫ জন খাউন্না মানুষ, আমার স্বামীর টাকা দিয়া চলতাম, এহোন আমাগো কি উপায় হইবো। আমার প্রতিবন্ধী পোলা ও অসুইক্কা হউর - হাউরিরে ( অসুস্থ শ্বশুর -শ্বাশুরী) কে  দেখবো? আমরা তো শেষ হইয়া গেছি"। নিজ স্বামীর জন্য বিলাপ দিতে দিতে কথা গুলো বলছিলেন মেঘনা নদীতে লক্ষীপুরে নৌ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত জেলে আমির হোসেনের স্ত্রী সুরভী বেগম। সোমবার ( ১১ এপ্রিল)  সকাল ১০ টার দিকে আমির হোসেনের মরা দেহ বাড়ি থেকে দাফন করতে নেওয়ার সময় বিলাপ দিতে দিতে এই কথাগুলো বলেন সুরভী বেগম।


 নিহতের পরিবারের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গত শনিবার সন্ধ্যার পর বাড়ি থেকে মাছ ধরতে যাওয়ার সময় তিন বছরের প্রতিবন্ধী ছেলে আসিফের হাতে ২০ টাকা দিয়ে, মা ও স্ত্রীকে দোয়া করতে বলে বাড়ি থেকে মাছ ধরতে বের হন জেলে আমির হোসেন। যাওয়ার সময় বলে গেছেন, "আমার জন্য দোয়া করিও, আমি এশারের নামজের সময় আসমু"। এটাই ছিলো নৌ পুলিশের সাথে সংঘর্ষে নিহত জেলে আমির হোসেনের পরিবারের সাথে তাঁর শেষ কথা। পাঁচ সদস্যের পরিবারে আমির হোসেন ছিলেন একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। ১৮ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন তিনি। ঘরে অসুস্থ্য মা ও প্রতিবন্ধী শিশুকে নিয়ে চলতো তাঁর জীবন। এনজিওসহ বিভিন্ন মানুষের কাছে আড়াই লক্ষ টাকা ঋণ ছিল আমিরের। সপ্তাহে দুই টা কিস্তি ও মাসিক  একটি কিস্তি দিতে হতো। এ সব অভাবের তাড়নায় কোনো উপায় না পেয়ে সেই দিন রাতে মাছ শিকার করতে গেছেন বলে জানান তাঁর  পরিবার।
কিন্তু শনিবার দিবাগত রাতে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে মাছ শিকার করতে গিয়ে পুলিশের সাথে সংঘর্ষে জীবন প্রদীপ নিভে যায় আমির হোসেনের। এই খবর শুনে ৭৫ বছর বয়সী অসুস্থ্য বৃদ্ধ বাবা মোতালেব রাঢ়ী শোকে স্বব্ধ হয়ে গেছেন। কোনো কথাই বলতে পারছেন না তিনি। ছেলের শোকে শুধু চোখ বেয়ে পানি বের হচ্ছে।


মা ছকিনা বেগম কান্নাজড়িতকন্ঠে বলেন, " আমার পোলার দোষ নাই, হেরা আমার পোলারে গুলি কইরা মারছে"। আমি পোলা হত্যার বিচার চাই। আমিরের বোন নার্রগিস বেগম বলেন, নদীতে নৌ পুলিশের সাথে ভাইদের কোনো ঝামেলা হয়নি।ঝামেলা হইছে অন্য ট্রলারের সাথে। কিন্তু তারপর ও তাদের উপর গুলি চালাইছে নৌ পুলিশ।


জানা গেছে, ভোলা সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়নের চর মোহাম্মদ আলী গ্রামের আমির হোসেনসহ ১১ জন জেলে স্থানীয় মনির চৌকিদারের ট্রলার নিয়ে মেঘনা নদীতে মাঝ শিকার করতে যায়। এসময় ভোলা - লক্ষীপুর সীমান্তবর্তী এলাকায় টহলরত নৌ পুলিশের  সাথে জেলের সংঘর্ষ হয়। সংঘর্ষে আমির হোসেনসহ ১১ জেলে আহত হয়।  পরে শনিবার ১১ টায়ে আমির হোসেন কে ঢাকা মেডিকেল নেওয়ার ১ ঘন্টা পরে আমির হোসেন মারা যায়। আমির হোসেনের পরিবারসহ  অন্যান্য জেলেদের দাবি আমির হোসেন সংঘর্ষের সময় নৌ পুলিশ জেলের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। আর নৌ পুলিশের গুলিতেই আমির হোসেন মারা যায়। তবে নৌ পুলিশের দাবি তাদের গুলিতে আমির হোসেন মারা যায় নেই। বরং জেলেদের ইটপাটকেল আঘাতেই আমির হোসেন মৃত্যু হয়।


লক্ষীপুর মজু চৌধুরীরহাট ঘাটের নৌ পুলিশের ইনচার্জ মোঃ জামাল বলেন, নৌ পুলিশের গুলিতে কেউ মারা যায় নাই। তবে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট  আসলে তাঁর মৃত্যু কিভাবে হয়েছে বলা যাবে। জেলেদের ইটপাটকেলের আঘাত নৌ পুলিশের পাঁচ সদস্য আহত হয়েছে। তাঁরা হাসপাতালে ভর্তি রয়েছে।
ভোলার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সুজিত কুমার হাওলাদার বলেন, আগে ঘটনার সঠিক তদন্ত হবে। তদন্তে যদি  জেলেরা নির্দোষ প্রমাণিত হয় তাহলে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে জেলে পরিবারকে সহায়তা দেওয়া হবে।