অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শুক্রবার, ১৮ই জুন ২০২১ | ৪ঠা আষাঢ় ১৪২৮


রক্ত যোদ্ধার আরেক নাম হাসিব শান্ত


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০শে মে ২০২১ রাত ১১:০২

remove_red_eye

৩৭

এম শরীফ  আহমেদ : রক্তদান নিয়ে আমাদের মনে রয়েছে নানা প্রশ্ন,মতামত, অভিযোগ এবং শঙ্কা। অনেকে মনে করেন রক্তদান করলে শরীরে রক্তের অভাব হয়। এক দশক আগেও রোগীর রক্তের প্রয়োজন হলেই শঙ্কা জেঁকে বসত স্বজনদের মনে, কোথায় মিলবে রক্ত। উপায়ান্তর না দেখে অনেকেই ধরনা দিতেন পেশাদার রক্তাদাতাদের কাছে।
টাকা দিয়ে কেনা রক্ত রোগীর শরীরে দিয়ে সাময়িক প্রয়োজন মিটলেও ভর করত আরেক দুশ্চিন্তা। রোগ সারাতে আরেক রোগে আক্রান্ত হচ্ছে না তো? স্বল্প কিছু জায়গা ছাড়া রক্ত নিয়ে দুশ্চিন্তার সময় এখন অনেকটা অতীত।
বর্তমান সময়ে তরুণরা যখন নেশায় আসক্ত, গেমস নিয়ে এবং আড্ডায় ব্যস্ত থাকে। এমন সময়ে ভোলার এক তরুণকে পাওয়া গেলো ভিন্ন নেশার। এ নেশা ধ্বংসের নয়।এ নেশা মানুষকে বাঁচানোর নেশা। মানুষকে সহযোগিতার নেশা। মানুষকে হতাশা থেকে বাঁচানোর নেশা। এই তরুণের নেশা রক্ত দেওয়া এবং রক্তদাতা ব্যবস্থা করে দেওয়া।
এতক্ষণ যার গল্প  বলছিলাম সেই  রক্তযোদ্ধা তরুণের নাম হাসিব শান্ত।তিনি সারাদিন অপেক্ষায় থাকেন একটি আহ্বানের, একজন মুমূর্ষু রোগীকে বাঁচাতে রক্তের প্রয়োজন।খবর পেলেই ছুটে ডোনারের খোঁজে। তার রক্তের খোঁজার জায়গা অনলাইন। কল বা মেসেজ পাওয়ার সাথে সাথেই ডোনারকে কল করা শুরু করেন।ডোনার ম্যানেজ হলেই ডোনারকে নিয়ে নিয়ে ছুটেন রোগীর কাছে। অনেক সময় নিজে যেতে না পারলে রোগীর স্বজনের কাছে সেই ডোনারের নাম্বার হস্তান্তর করেন।উভয়ের ভিতর যোগাযোগ করা হলে তিনি ছুটেন পরবর্তী ডোনারের খোঁজে।প্রতিটা দিনই কাটে তার এভাবে।
ভোলা জেলা সহ দেশের বিভিন্ন জেলার ডোনারদের তালিকা রয়েছে তার কাছে। প্রতিনিয়ত নানা কাজে যার সাথে সাক্ষাত হয়, সেসব ব্যক্তিদের মোবাইল নাম্বার নেওয়ার পাশাপাশি রক্তের গ্রুপটি সাথে নিয়ে নেন।এছাড়া যাদেরকে রক্ত ম্যানেজ করে দেন তাদের যোগাযোগ নাম্বার এবং গ্রুপও সাথে সাথে নোট করে নেন। এভাবে তার কাছে জমা হতে থাকে বেশ বড় এক তালিকা। সেই তালিকাকে কাজে লাগান বিভিন্ন সময়ে। রক্তযোদ্ধা এই তরুণ দৈনিক  গড়ে ১০-১২জন ডোনার ব্যবস্থা করে দেন। আনুমানিক একটা হিসাব করলে ধরা যায় এ পর্যন্ত তিনি হাজারেরও বেশি ডোনার ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। শুধু ডোনার ব্যস্থা নয়, নিজেও রক্ত দিয়েছেন এই পর্যন্ত  ১৪বার।ডোনার ম্যানেজ করার পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের সহযোগিতা,অসহায় রোগীদের জন্য অর্থ সংগ্রহ,  উপকূলের নানা সমস্যা নিয়ে কাজ করছেন এই তরুণ।
রক্তযোদ্ধা এই তরুণের জম্ম ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরা উপজেলার চরফৈজুদ্দিনে।বুঝে ওঠার আগেই তার পিতা শাহজাহান একটি ভয়াবহ দূর্ঘটনায় আগুনে দগ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। মা রানু বেগম একজন গৃহিণী। মাত্র তিন বছর বয়সে বাবাকে হারিয়ে তার পরিবারটা অনেকটা নিঃস্ব হয়ে পড়েন। পরিবারের দায়িত্ব কাঁধে নেন তার মামা,চাচা, দাদাসহ অন্য আত্মীয়রা।
তার সামাজিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৭সালে। ভোলার তরুণ উদ্যোক্তা,স্বেচ্ছাসেবী ও সাংবাদিক এম শরীফ আহমেদ(সম্পর্কে মামা) এর কাজ দেখে উদ্ধুদ্ধ হোন তিনি। ভোলার মনপুরা উপজেলার রক্ত প্রয়োজন হলেই যার নাম উঠে আসে তিনিই হচ্ছেন "হাসিব শান্ত"।উপজেলা ছাড়িয়ে এখন তার কাজের বিস্তার ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন জেলায়।
প্রথমে তার মামার কাজ দেখে তিনি উদ্ধুদ্ধ হয়ে কাজ শুরু করেন। বর্তমানে "নিঝুম বøাড ফাউন্ডেশন" এর মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি ডোনার সংগ্রহ করে থাকেন। এছাড়াও তিনি কাজ করছেন "গুড ড্রীম বাংলাদেশ" "ভোলা বন্ধুসভা" এবং "উপকূল ফাউন্ডেশন"সহ কয়েকটি  সংগঠনে।
অদম্য এই তরুণ এর বাবা না থাকায় ছোট বয়স থেকে পরিবারের  দায়িত্বভার আসে তার কাঁধে। ২০১০ সাল থেকে কাজ শুরু করেন। এই অল্প বয়সে তার কাজের অভিজ্ঞতাও কম নয়। কাজ করেছেন-টেলিকম কোম্পানি, গার্মেন্টস, বেকারি, ফার্মেসী, রাইড শেয়ারিং, ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট, রেস্টুরেন্টসহ নানা প্রতিষ্ঠানে। বর্তমানে কাজ করছেন জনপ্রিয় রাইড " ভোলা কায়াকিং পয়েন্ট" এর ম্যানেজার হিসেবে।চাকরির পাশাপাশি অবসর সময়ে করছেন সামাজিক এসব কর্মকাÐ।     নানা প্রতিষ্ঠানে কাজ করায় তার অভিজ্ঞতার শেষ নেই।সেবার কাজে তিনি যেমন সুনাম বয়ে আনছে,চাকরিতে কাজের ক্ষেত্রেও তার বেশ সুনাম রয়েছে।
তবে অদম্য  এই তরুণ  নিজেকে  চাকুরীজীবি হিসেবে নিজেকে দেখতে চান না,তিনি নিজেকে দেখতে চান একজন উদ্যোক্তা হিসেবে। নিজের কোম্পানির থাকবে,যেখানে অন্যদের কর্মসংস্থান তৈরী হবে। কিন্তু পুঁজি না থাকায় তিনি নিজ উদ্যোগে এখনো কোনো কিছু শুরু করতে পারেনি।
আলাপকালে অদম্য  তরুণ  হাসিব শান্ত বলেন, বাবা না থাকায় বুঝেছি, পৃথিবীতে বাবা ছাড়া বেঁচে থাকা কতটা কঠিন,কতটা অসহায়। তবে নিজের অসহায়ত্বের চাইতে রক্তের জন্য  চারপাশের রোগীর স্বজনদের অসহায়ত্ব আমার মনে নাড়া দিয়েছে। স্বজনদের এমন অসহায়ত্ব দূর করতে আমি সামাজিক কাজ শুরু করি।
আমার জানামতে একটি মানুষও যেনো মৃত্যুবরণ না করে সে প্রতিজ্ঞায় দিনরাত কাজ করছি। প্রত্যেকের কাছে আমার একটি আহ্বান, আপনারা পরিবারের সকলের রক্তের গ্রুপ জেনে  রাখবেন। আর নিজেদের পরিবারের জন্য নিজেরা রক্ত দিতে চেষ্টা করবেন। তাহলে দেখবেন রক্তের প্রয়োজন হলে ডোনারদের দ্বারে দ্বারে তখন আর ঘুরা লাগবে না।