অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বৃহঃস্পতিবার, ৮ই অক্টোবর ২০২৬ | ২২শে আশ্বিন ১৪৩৩


মা ইলিশ রক্ষায় ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা চরফ্যাশনে সংকটে হাজারো জেলে


চরফ্যাসন প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ৭ই অক্টোবর ২০২৬ রাত ১০:৫৫

remove_red_eye

১৫

খাদ্য সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়ম ও প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগ
 
 
এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন  : মা ইলিশের প্রজনন নির্বিঘ্ন করতে ৮ থেকে ২৯ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত ২২ দিন ইলিশ আহরণ, পরিবহন, মজুত ও বিক্রিতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সরকার। এ নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে ভোলার চরফ্যাশনের উপকূলীয় জেলেরা বিপাকে পড়েছে । নদীতে মাছ ধরা বন্ধ থাকায় জীবিকা নিয়ে অনিশ্চয়তার পাশাপাশি সরকারি খাদ্য সহায়তার চাল বিতরণে অনিয়ম ও প্রকৃত জেলেদের বঞ্চিত হওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
জেলেদের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার সময়ে পরিবার নিয়ে জীবনধারণ কঠিন হয়ে পড়ে। বরাদ্দের তুলনায় নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা বেশি হওয়ায় অনেকে সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। তাঁদের দাবি, প্রকৃত জেলেদের তালিকা যাচাই করে সহায়তা বিতরণ ও বরাদ্দ বাড়াতে হবে। 
চরফ্যাশনের মাদ্রাজ ইউনিয়নের সামরাজ মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে নিষেধাজ্ঞার আগে জেলেদের জাল সংস্কারে ব্যস্ত দেখা যায়। তবে তাঁদের মধ্যে ছিল অনিশ্চয়তা। তাঁরা জানান, জলবায়ু পরিবর্তন, নদীতে মাছ কমে যাওয়া ও বিপুলসংখ্যক ফিশিং বোটের কারণে আয় কমেছে। সংসারের ব্যয়, সন্তানদের ভরণপোষণ এবং এনজিও ও দাদন ব্যবসায়ীদের ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে তাঁরা চাপে আছেন।
‘এফবি মায়েরদোয়া’ বোটের জেলে ফরিদ উদ্দিন বলেন, “নদীতে মাছ ধরা বন্ধ হলে আমরা না খেয়ে থাকার মতো অবস্থায় পড়ি। সরকারি সহায়তা প্রকৃত জেলেদের হাতে পৌঁছায় না। চালের স্লিপ বিতরণে প্রভাবশালীরা আত্মীয়-স্বজনকে প্রাধান্য দেয়। জেলে কার্ড যাচাই না করেই চাল বিতরণ করা হয়। গত দুই বছরে আমি এক কেজি চালও পাইনি।”
‘মেঘনা-২’ বোটের জেলে জহির উদ্দিন বলেন, “৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে কোনো চাল, ডাল কিংবা মৎস্য বিভাগের সহায়তা পাইনি। সন্তানদের নিয়ে খুব কষ্টে দিন কেটেছে। মাছ ধরা বন্ধ থাকলে সংসার কীভাবে চালাব, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছি।
জেলে হোসেন বেপারির অভিযোগ, দীর্ঘদিন জেলে পেশায় থাকলেও তিনি নিষেধাজ্ঞার সময় সহায়তা পাননি। তাঁর দাবি, অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতির কারণে প্রকৃত কার্ডধারীরা বঞ্চিত হচ্ছেন।
হাজারিগঞ্জ ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের জেলে মোতালেব বলেন, “২০ বছর ধরে নদীতে মাছ ধরছি। অথচ আজও একটি জেলে কার্ড পাইনি। সরকারি কোনো সুবিধাও পাইনি।”
জেলে মো. হোসেন বলেন, “ভোটের সময় নেতারা প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নিষেধাজ্ঞায় ঘাটে বেকার বসে থাকলেও কেউ খোঁজ নেন না। আমাদের চাল না দিয়ে ব্যবসায়ী, মোটরসাইকেলচালক কিংবা রিকশাচালকদের দেয়া হয়।”
কালকিনির চরের মাঝি আবুল কাশেমের অভিযোগ,বড় ট্রলার ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের কেউ কেউ আইন অমান্য করে মাছ শিকার করলেও সাধারণ জেলেরাই বেশি হয়রানির শিকার হন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, চরফ্যাশনে নিবন্ধিত জেলে ৪১ হাজার ২০০ জন। এবার ৩৫ হাজার ৬৫৬ জনের জন্য জনপ্রতি ২৫ কেজি করে মোট ৮৯১ দশমিক ৪ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ হয়েছে। ফলে ৫ হাজার ৫৪৪ জন নিবন্ধিত জেলে বরাদ্দের বাইরে রয়েছেন।
জেলেদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২২ দিনের জন্য জনপ্রতি ২৫ কেজি চাল দিয়ে পরিবারের খাবার, ঋণের কিস্তি, চিকিৎসা ও সন্তানদের পড়াশোনার ব্যয় মেটানো কঠিন। নিষেধাজ্ঞার সময়ে ঋণের কিস্তি আদায়ে চাপ না দেয়ার আশ্বাস থাকলেও বাস্তব সুফল নিয়ে তাঁদের শঙ্কা রয়েছে।
চরফ্যাশন উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা জয়ন্ত কুমার অপু বলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য মা ইলিশ রক্ষা করা। নিষেধাজ্ঞা অমান্য করলে অন্তত ছয় মাসের কারাদণ্ড এবং জেলে কার্ড বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে নিবন্ধিত প্রকৃত জেলেরা যাতে মানবিক সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব।
তিনি বলেন, চাল বিতরণের তালিকা তৈরি ও বিতরণ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে গঠিত কমিটির কাজ। কোনো প্রকৃত জেলে চাল না পেলে বা তালিকা থেকে বাদ পড়লে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করা হবে। মাঠপর্যায়ে মনিটরিং চলছে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজ বলেন, “চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম, কম দেয়া বা স্বজনপ্রীতি বরদাশত করা হবে না। ট্যাগ অফিসারের উপস্থিতিতে স্বচ্ছভাবে চাল বিতরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, চাল আত্মসাৎ বা বিতরণে অবহেলা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো প্রকৃত বা কার্ডধারী জেলে চাল না পেলে উপজেলা প্রশাসনে অভিযোগ করতে পারবেন।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, নিবন্ধিত প্রকৃত জেলেদের তালিকা পুনরায় যাচাই, বরাদ্দ বৃদ্ধি ও বিতরণে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। তাঁদের মতে, জেলেদের ন্যূনতম জীবিকা নিশ্চিত হলেই মা ইলিশ সংরক্ষণে তাঁদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা বাড়বে।

 


মোঃ ইয়ামিন