অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বুধবার, ২৫শে নভেম্বর ২০২০ | ১১ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


উনসত্তরের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ’র জন্মদিনে অকৃত্তিম শুভেচ্ছা


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২২শে অক্টোবর ২০২০ সকাল ০৮:০৭

remove_red_eye

১৮৭

আসমা আক্তার সাথী: বাংলার গণ মানুষের নেতা, দ্বীপ জেলা ভোলার অহংকার, বঙ্গবন্ধুর একান্ত বিশ্বস্ত সহচর, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের একজন সহযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধের গেরিলা সংগঠক জনাব তোফায়েল আহমেদ’র আজ জন্মদিন। প্রিয় নেতা আপনাকে জন্মদিনের অকৃত্তিম শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা। আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে এমন এক জন বর্ষীয়ান নেতার জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখা এক দু:সাহসিক কাজ বটে। তবু চেষ্টার কোন ত্রুটি থাকবে না। বঙ্গবন্ধুর স্নেহধন্য, ৬৯ এ পূর্ব বাংলার অবসিংবাদিত ছাত্রনেতা তোফায়েল আহমেদের জন্ম ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে। পিতা মৌলভী আজহার আলী, মা ফাতেমা বেগম। ৩ ভাই ৪ বোন। ভাইদের মধ্যে সবার ছোট , মায়ের খুব আদরের সন্তান তিনি। ছোটবেলা থেকেই ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী। প্রাথমিক শিক্ষা জীবন শেষ করেন নিজ গ্রামে। বর্ষাকালে স্কুলে যেতেন খালি পায়ে, কারণ কোন রাস্তা ঘাট ছিল না কোড়ালিয়া গ্রামে। ক্লাসে প্রথম হতেন বরাবর ৯০ এর বেশী নম্বর পেয়ে । লেখা পড়ার তাগিদে অষ্টম শ্রেণী থেকেই বাড়ি ছাড়তে হয় তাকে। ভর্তি পরীক্ষায় প্রথম স্থান অর্জন করে হোস্টেলে থেকে পড়া শুরু করেন ভোলা সদর সরকারি বালক বিদ্যালয়ে। এখান থেকে মেট্ট্কি পাশ করেন ১৯৬০ সালে। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ার সময়ই দেখা পান বঙ্গবন্ধুর। তন্ময় হয়ে শোনেন তাঁর বক্তৃতা। তখনই ভাবেন জীবনে কখনও রাজনীতি করলে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে গড়া আওয়ামী লীগই করবেন্ । যদিও স্বপ্ন ছিল ডাক্তার হবার। কিন্তু রাজনীতির চক্করে সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত না হলেও মেয়ে আজ ডাক্তার। স্কুল জীবন থেকেই মানসিক ভাবে জড়িয়ে পরেন রাজনীতিতে। এরপর চলে যান ঢাকায়। ভর্তি হন ঢাকা কলেজে। কিন্তু মাকে ছেড়ে থাকতে পারেন না ঢাকায় । মায়ের সাথে দেখা করতে পারার সুবিধার জন্য চলে আসেন ভোলা থেকে কাছাকাছি দূরত্বের বরিশাল বিএম কলেজে। কলেজ ছুটির সাথে সাথেই ২/৩ ঘন্টার মধ্যেই যাতে ফিরতে পারেন মায়ের কোলে। এদিকে বিএম কলেজে দেখা পান এক বছরের সিনিয়র আওয়ামীলীগের আর এক বর্ষীয়ান নেতা আমির হোসেন আমুর। তার প্রেরণায় প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পরেন ছাত্র রাজনীতিতে। বরিশাল ব্রজমোহন কলেজ থেকে ১৯৬২ সালে আইএসসি পাস করেন এবং একই সালে বরিশালে বঙ্গবন্ধুর সাথে তার প্রথম দেখা। বিএসসি পড়ার সময় বিএম কলেজে ভিপি পদে নির্বাচনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন ডাক্তার হবার আশায়। কিন্তু ক্রীড়াবিদ হবার কারণে ক্রীড়া সম্পাদক পদে প্রতিদ্বন্দিতা করে ছাত্রলীগ প্যানেল থেকে একমাত্র তিনিই বিজয় লাভ করেন সে সময়। এরপর বিএসসি পাস করে ১৯৬৪ সালে ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগে। ইকবাল হলে থাকতে শুরু করেন। শুরু হয় রাজনীতির সাথে তুমুল সখ্যতা। রাজনৈতিক জীবন : এ সময় নির্বাচন করে তিনি ডাকসুর ভিপি হন। ১৯৬৭ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত ডাকসুর ভিপি থাকাকালে চারটি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রদত্ত ছয় দফাকে হুবহু ১১ দফায় অন্তর্ভুক্ত করে ’৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দেন তিনি। ১৯৬৯-এ তিনি ছাত্রলীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা’র সব রাজবন্দীকে নিঃশর্ত মুক্তিদানে তোফায়েল আহমেদের নেতৃত্বে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ সারা বাংলায় তৃণমূল পর্যন্ত তুমুল গণআন্দোলন গড়ে তোলেন এবং ’৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সব রাজবন্দীকে মুক্তিদানে স্বৈরশাসককে বাধ্য করেন। পরদিন ২৩ ফেব্রুয়ারি রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে জাতির জনককে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন ১৯৬৯ সালের গণ অভ্যুত্থানের মহানায়ক তোফায়েল আহমেদ। মিছিল মিটিং হরতালের সেই উত্তাল দিনগুলোর তুখোর ছাত্রনেতা আজকের তোফায়েল আহমেদ। ১৯৭০-এর ৭ জুন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে আওয়ামী লীগে যোগ দেন। ছাত্র জীবনেই তিনি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একান্ত সাহচর্যে আসেন। ১৯৭০ সালে ঐতিহাসিক নির্বাচনে ভোলার দৌলতখান-তজুমদ্দিন-মনপুরা আসন থেকে মাত্র ২৭ বছর বয়সে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। তোফায়েল আহমেদ ছিলেন ১৯৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে ‘মুজিব বাহিনী’র অঞ্চল ভিত্তিক দায়িত্বপ্রাপ্ত চার অধিনায়কের অন্যতম। ১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট জাতির জনকের নির্মম হত্যাকান্ডের পর ৬ সেপ্টেম্বর তোফায়েল আহমেদকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘ ৩৩ মাস তিনি কারান্তরালে ছিলেন। ১৯৭৮-এ কুষ্টিয়া কারাগারে থাকা অবস্থায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক পদে নির্বাচিত হন। বঙ্গবন্ধুর কাছাকাছি থাকার কারণে তিনি মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনার সাক্ষী। রাজনীতির গ্যাড়াকলে জেল জুলুমের শিকার হয়েছেনে বহুবার। মৃত্যুর দুয়ার থেকেও ফিরে এসেছেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় ভূমিকা : ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পরবর্তীকালে ১৪ জানুয়ারি ১৯৭২ তারিখে প্রতিমন্ত্রীর মর্যাদায় বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সচিবের দায়িত্ব লাভ করেন। তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসাবে ১৯৭৩, ১৯৮৬, ১৯৯১, ১৯৯৬, ২০০৮ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয় লাভ করেন। অ২০১৪ সালে তিনি বিনা-প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এমপি নির্বাচিত হন ও ২০১৮ সনে ভোলা-১ আসন থেকে পূনরায় সংসদ সদস্য নিবার্চিত হন। ১৯৯৬ সালের ২৩ জুন তিনি শেখ হাসিনা সরকারের শিল্প ও বাণিজ্য মন্ত্রীর দায়িত্ব প্রাপ্ত হন। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ অওয়ামী লীগের সভাপতি মন্ডলীর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ২০১৮ পর্যন্ত। তিনি বর্তমানে আওয়ামীলীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য। রাজনীতির বাইরেও ব্যক্তিগত চরিত্র ও আচরণে অমায়িক এই সংগ্রামী রাজনীতিকের পরোপকার, বদান্যতা, সাহিত্য-সংগীত ও সুকুমার শিল্পের প্রতি বিশেষ আগ্রহ তার মনন ও চেতনাকে মহিমান্বিত করেছে। লেখক: শিক্ষক ও সাংবাদিক ।