অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, সোমবার, ১লা জুন ২০২৬ | ১৮ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


ভোলায় ঈদ কেটেছে বিদ্যুতের অপেক্ষায়


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১লা জুন ২০২৬ সকাল ১১:১৭

remove_red_eye

৩৯

কোরবানির মাংস বাঁচাতে বরফ নিয়ে যুদ্ধ ভোগান্তিতে হাজারো পরিবার

মলয় দে : ঈদের সকালে কোরবানির পশু জবাই শেষে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মাংস ভাগাভাগি করে ফ্রিজে তুলে রেখেছিলেন ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশা সুদুরচর এলাকার বাসিন্দা পঞ্চাশোর্ধ পারুল বেগম। পরিকল্পনা ছিল ঈদের কয়েকদিন আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে কোরবানির মাংসের নানা পদ রান্না করবেন। কিন্তু ঈদের আনন্দের সেই পরিকল্পনা ভেস্তে যায় বিদ্যুৎহীনতার কাছে। ফ্রিজে রাখা মাংস ও মাছ বাঁচাতে বাজার থেকে বরফ কিনে ককসিটের বাক্সে রেখেছিলেন। তবুও শেষ রক্ষা হয়নি। কয়েকদিন পর দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করলে অনেক মাংস ফেলে দিতে বাধ্য হন তিনি।
পারুল বেগমের মতো একই দুর্ভোগে পড়েছেন ভোলার হাজারো পরিবার। ঈদুল আজহার আনন্দের সময় টানা কয়েকদিনের বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন এলাকার গ্রাহকরা। কোরবানির মাংস সংরক্ষণ থেকে শুরু করে স্বাভাবিক জীবনযাপন, জীবিকা নির্বাহ—সব ক্ষেত্রেই চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে তাদের।
ঈদের আগের দিন সকালে আকস্মিক ঝড়ে বোরহানউদ্দিন বিদ্যুৎ পাওয়ার প্ল্যান্ট থেকে জেলার প্রধান বিদ্যুৎ সঞ্চালন লাইনের তার ছিঁড়ে যায়। মুহূর্তেই অন্ধকারে ডুবে যায় পুরো জেলা। ঝড়ের তাণ্ডবে বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুতের খুঁটি, ট্রান্সফরমার ও বিতরণ লাইন ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঝড়ের দিন সন্ধ্যার পর শহরের ওজোপাডিকোর আওতাধীন অধিকাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ ফিরলেও পল্লী বিদ্যুতের আওতাধীন বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষকে অপেক্ষা করতে হয়েছে দিনের পর দিন। বিশেষ করে ভোলা সদর উপজেলার কাচিয়া,উত্তর বাপ্তা ইউনিয়নের একাংশ, পূর্ব ইলিশা, পশ্চিম ইলিশা,রাজাপুর, ভেলুমিয়া এসব ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রামের বসবাসকারী গ্রাহকরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
ঈদের সবচেয়ে বড় দুর্ভোগ হয়ে দাঁড়ায় কোরবানির মাংস সংরক্ষণ। ফ্রিজ অচল হয়ে যাওয়ায় মানুষ বাধ্য হয়ে বরফের ওপর নির্ভর করেন। শহর ও গ্রামের বাজারগুলোতে হঠাৎ করেই বরফের চাহিদা বেড়ে যায়। অনেকে ককসিটের বাক্স কিনে বিকল্প উপায়ে মাংস সংরক্ষণের চেষ্টা করেন। কিন্তু টানা কয়েকদিন বিদ্যুৎ না থাকায় সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়।
সদর উপজেলার বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা  যায় স্থানীয়দের দূর্ভোগ ও হতাশার চিত্র। গণমাধ্যমকর্মী  পরিচয় দিতেই সবাই যে যার মতো শুরু করলেন ক্ষোভ ও কষ্ট প্রকাশ করতে।তাদের ভোগান্তি সচক্ষে দেখতে কয়েকটি বাড়িতে গিয়ে দেখা মেলে বরফ ভর্তি ককসেট।যেখানে কোরবানির মাংস ও ফ্রিজে থাকা মাছ সংরক্ষণ করে রেখেছেন।ককসিট খুলতেই বেড়িয়ে আসে দূর্গন্ধ।এতে বুঝতে বাকী রইলো না ওই ককসিটের বাক্সে থাকা মাছ ও মাংসের অবস্থা।এরপর কয়েকটি ঘরের ফ্রিজ খুলে দেখা গেলো মাছ ও মাংসের করুন দশা। এতে বুঝতে বাকী নেই তাদের ক্ষোভের কারন।
আগামীর সময়ের কথা হয় বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর সাথে।পশ্চিম ইলিশার সুদুরচরের বাসিন্দা মো.হেলাল উদ্দিন,মো. আসিফ ও গৃহবধূ লাইজু জানান, “ঈদের সময় এত মাংস একসঙ্গে রান্না করা সম্ভব নয়। ফ্রিজে রাখার জন্যই সংরক্ষণ করা হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ না থাকায় বরফ কিনেও মাংস বাঁচাতে পারিনি। শেষ পর্যন্ত অনেক মাংস ফেলে দিতে হয়েছে।”
ওই একই এলাকার ষাটোর্ধ বৃদ্ধা ফজিলাতুন্নেছার ভাষ্য,বয়স হয়েছে।তার উপর অসুস্থ মানুষ।এতোদিন বিদ্যুৎ না এলে কিভাবে থাকি বলেন?কোরবানির মাংস সব নষ্ট হয়ে গেছে।আর মনে হয় এ মাংস খাওয়া যাবে না।”

একই এলাকার বাসিন্দা তাজল ইসলাম জানান,বিদ্যুৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার কারনে ঈদের দিনই শহরের একটি দোকানে ডীপ ফ্রিজ ভাড়া করেছেন তিনি।কোরবানির মাংস এখন ওই ফ্রিজে রাখা আছে।
তবে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে আরো জানান,তার এলাকার বেশীর লোকজনের মাংস এখন পঁচে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছে ।
বিদ্যুৎতের খোঁজ খবর নিতে পশ্চিম ইলিশা থেকে উত্তর বাপ্তা এলাকায় গিয়ে কথা হয়  টগবী স্কুল সংলগ্ন এক মুদি দোকানদার মো. নিরবের সাথে। তার ভাষ্য “সারা বছর অপেক্ষা করি ঈদের জন্য। কিন্তু এবার ঈদের আনন্দের চেয়ে দুশ্চিন্তাই বেশি ছিল। কখন বিদ্যুৎ আসবে, মাংস নষ্ট হলো কি না—এসব নিয়েই দিন কেটেছে।পরে বাধ্য হয়ে শহরের এক আত্মীয়ের বাসায় মাংস রেখে আসছি।”
এদিকে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়,শুধু গৃহস্থ পরিবার নয়, দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিপর্যয়ে ক্ষতির মুখে পড়েছেন ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা চালকরাও। চার্জ দিতে না পারায় অনেক চালক ঈদের ব্যস্ত সময়েও গাড়ি নিয়ে বের হতে পারেননি। ফলে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে পড়েছে শত শত পরিবারের।
ভোলা সদরের অটোরিকশা চালক মাসুম ও মো.জসিমের বক্তব্য, “ঈদের সময় সাধারণত সবচেয়ে বেশি আয় হয়। কিন্তু গাড়ি চার্জ দিতে না পারায় কয়েকদিন বসে থাকতে হয়েছে। পরিবার নিয়ে কষ্টে দিন পার করেছি।”
আবার সদর উপজেলা পশ্চিম ইলিশা সুদুরচড়ের অটোচালক ফরিদের স্ত্রী মিনারা অনেক আক্ষেপ নিয়ে বলেছেন,”এমন কোরবানির ঈদ গেলো, কোরবানি দেয়া তো দূরের কথা এক কেজি গোশত কিনেও খেতে পারেন নি। বিদ্যুৎ না থাকায় তার অসুস্থ স্বামী ফরিদ অটোরিকশা চালাতেই পারে নি।তাই এবছর আর গোশত কেনার সামর্থ্য হয়নি।”
এমন দীর্ঘ ভোগান্তির কারণে বিভিন্ন এলাকায় ক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয়রা জানান, কয়েকদিন আগে ভোলা সদর উপজেলার পশ্চিম ইলিশার সুদূর চর এলাকায় ক্ষুব্ধ গ্রাহকরা পল্লী বিদ্যুতের লাইনম্যানদের ব্যবহৃত মোটরসাইকেল আটকে রাখেন। পরে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
ভুক্তভোগী ইব্রাহিম,মো.জসিম ও সুমনের অভিযোগ, ঝড় একটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলেও বিদ্যুৎ সরবরাহ পুনরুদ্ধারে প্রত্যাশিত তৎপরতা দেখা যায়নি। অভিযোগ জানাতে গিয়ে অনেকেই কর্মকর্তাদের কাছ থেকে সন্তোষজনক উত্তর পাননি বলেও দাবি করেছেন। আবার কেউ কেউ গালাগাল ও দূর্ব্যবহারের অভিযোগও তুলেছেন পল্লী বিদ্যুৎতের কর্মরত স্টাফদের বিরুদ্ধে।
এদিকে ভোলায় সামান্য ঝড়ো বাতাস বা আকস্মিক ঝড় এলেই গাছের ডাল ভেঙে তার ছিড়ে যাওয়ার ঘটনা এখন প্রতিনিয়তই ঘটছে।স্থানীয়দের অনেকেই আশঙ্কা করছেন হয়তো নিম্নমানের তার ব্যবহারের ফলেই কিছুদিন পর পর এমন ঘটনা ঘটছে।
স্থানীয়দের দাবি, বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও বিতরণ লাইনে টেকসই তারের ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি দুর্যোগকালীন সময়ে বিকল্প উপায়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ চালুর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে এ ধরনের দীর্ঘস্থায়ী ভোগান্তি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।
পল্লী বিদ্যুৎ সূত্রে জানা গেছে, জেলায় তাদের গ্রাহক সংখ্যা ৪ লাখ ৩৫ হাজারের বেশী। এর মধ্যে শুধু ভোলা সদর উপজেলাতেই রয়েছে প্রায় ৬০ হাজার গ্রাহক।
পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির সদর উপজেলার পরানগঞ্জ জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার রাজিব চন্দ্র ভৌমিকের দাবি, সদর উপজেলার প্রায় ৮৫ শতাংশ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করা হয়েছে। তবে বাকি ১৫ শতাংশ গ্রাহক এখনো অনিয়মিত বিদ্যুৎ কিংবা বিদ্যুৎবিহীন অবস্থার মধ্যে রয়েছেন।লোকবল সংকট ও ঈদে অনেকে ছুটিতে থাকায় এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।তবে এখন পুরো দমে কাজ চলছে বলে জানান এ কর্মকর্তা।পাশাপাশি তিনি আশা প্রকাশ করে বলেছেন, ২-১ দিনের মধ্যে এ সমস্যা সমাধান হবে।
অন্যদিকে জেলা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার শাহ মো : রাজ্জাকুর রহমান বলেছেন, ঝড়ে জেলার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়ায় মেরামত কাজে সময় লেগেছে। ক্ষতিগ্রস্ত লাইন সংস্কার এবং বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক করতে কর্মীরা নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছেন।তিনি আাশা করছেন খুব শীঘ্রই এ সমস্যা সমাধান হবে।
ঈদের আনন্দ যখন পরিবারের সবাইকে ঘিরে থাকার কথা, তখন ভোলার অনেক মানুষের কাছে এবারের ঈদ কেটেছে বিদ্যুতের অপেক্ষায়। কারও ফ্রিজে রাখা কোরবানির মাংস নষ্ট হয়েছে, কারও আয় বন্ধ হয়েছে, আবার কেউ রাতের পর রাত অন্ধকারে কাটিয়েছেন। তাই ভোলার গ্রামাঞ্চলে এবারের ঈদের অন্যতম আলোচিত বিষয় কোরবানি নয়, বরং বিদ্যুৎহীনতার দীর্ঘ দুর্ভোগ।