অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, মঙ্গলবার, ২৩শে এপ্রিল ২০২৪ | ৯ই বৈশাখ ১৪৩১


নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে চলছে মাছ ধরার মহোউৎসব


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৩০শে মার্চ ২০২৪ রাত ০৮:২৭

remove_red_eye

৯৫

বিকল্প আয়ের অভাবে নদীতে নামছে জেলেরা মৎস্য বিভাগের অভিযানে ৪১০ জেলে আটক বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানা

 

মলয় দে : ইলিশসহ মাছের উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষে ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীর ১৯০ কিলোমিটার এলাকার অভায়াশ্রমে   পহেলা মার্চ - ৩০ শে এপ্রিল দুই মাস সব ধরনের মাছ ধরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ভেদুরিয়া থেকে পটুয়াখালীর চর রুস্তম পর্যন্ত তেঁতুলিয়া নদীর ১০০ কিলোমিটার এবং ইলিশা থেকে মনপুরা উপজেলার চর পিয়াল পর্যন্ত মেঘনা নদীর ৯০ কিলোমিটার এলাকায় সম্পূর্ণভাবে মাছ ধরা বন্ধ থাকার কথা। কিন্তু ভোলার জেলেরা সরকারি আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্যে নদীতে মাছ ধরছে।ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে এই সময়ে জেলে শূণ্য থাকার কথা থাকলেও কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। ভোলার মেঘনা নদীতে দিন দুপুরে জাল পেতে নির্বিচারে জাটকাসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ নিধণ করা হচ্ছে।পরবর্তীতে সে মাছ আবার ভোলার সবগুলো মাছ ঘাট ও বাজারে প্রশাসনের নজর এড়িয়ে হাক ডাক দিয়ে চলছে বেচা কেনা। তবে জেলেরা বলছে, পরিবার পরিজন নিয়ে চরম বিপাকে তারা। সমিতির কিস্তি পরিশোধ ও অনাহারে পেটের দায়ে নদীতে মাছ ধরতে যেতে হয়। এদিকে  ২  মাসের অভিযানে   সরকারি সহায়তাও পাচ্ছে না বেশীরভাগ জেলে। জাটকা সংরক্ষন কর্মসূচীর আওতায় ভিজিএফএর যে চাল দেয়া হচ্ছে তাতে নিবন্ধিত সকল জেলেরাই পাচ্ছে না। এতে করে বেকার হয়ে পড়া ভোলাসহ উপকূলীয় প্রায় ২  লাখ জেলে চরম বিপাকে দিন কাটাচ্ছে।

ভোলার মেঘনা নদীতে মাছ ধরে এমন এক জেলে মোঃ সাগর।সে  জানান,বছরের বেশীর ভাগ সময়েই নদী ও সাগরে মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞা থাকে।এ দুই মাস সরকার থেকে যে পরিমান চাল দেয় তা দিয়ে সংসার চলে না।চালের সাথে অন্যান্য বাজারও লাগে।আর সেগুলো কিনতে টাকার প্রয়োজন হয়।তাই বাধ্য হয়েই নদীতে মাছ ধরতে যেতে হয়।   

কথা হয় তুলাতুলি মাছঘাট এলাকার জেলে  মোঃ গিয়াসউদ্দিনে’র সাথে।তিনি বলেন,তার ঘরে লোকসংখ্যা ৮জন।নিষেধাজ্ঞায় সরকার থেকে প্রতিমাসে ৪০ কেজি করে চাল পান তিনি। সে চালে  এতো বড় সংসারে  কিছুই হয় না। তার উপর অন্যান্য বাজার,সন্তানের পড়ালেখার খরচ তো আছেই। তার পূর্ব পুরুষরা এ পেশার সাথে জড়িত ছিলো।সে নিজেও ছোট বেলা থেকে এ পেশার সাথে জড়িত। এ কাজ বাদ দিয়ে অন্য কোনো কাজ করা তার পক্ষে সম্ভব না।তাই সংসারের সকল খরচ যোগাতে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে নদীতে মাছ ধরতে যেতে হয় বলে জানান তিনি।

নিষেধাজ্ঞা সময়ে বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বেশীরভাগ  জেলে পরিবারগুলোর এনজিওর ঋণের কিস্তির  চাপে  এখন দিশোহারা হয়ে পড়েছে।প্রতি সপ্তাহে ঋণের কিস্তির টাকা যোগাতে নদীতে বাধ্য হয়ে মাছ ধরতে যেতে হয় বলে জানান সবুজ মাঝি নামে এক জেলে। 

১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞার জারীকৃত এলাকায় সব ধরনের মাছ ধরা, মজুদ, বিক্রি ও পরিবহন নিষিদ্ধ।  ২ মাস মাছ ধরা বন্ধ ঘোষনা করা হলেও এই নিষেধাজ্ঞা চলাকালিন সময়ে জেলেদের জন্য বিশেষ  কোন প্রনোদনা বা সহায়তা দেয়া হচ্ছে না। তবে জাটকা সংরক্ষন কর্মসূচীর আওতায়  ৮৯ হাজার ৬০০ জেলে পরিবারের জন্য  ৪ মাস ৪০ কেজি করে চাল দেয়া হচ্ছে। কিন্তু নিবন্ধিত সকল জেলের নামে বরাদ্ধ না আসায় আসায় নিবন্ধিত সকল জেলের ভাগ্যে চাল জুটছে না।

এ নিয়ে জেলে রফিক মিয়া বলেন,অনেক জেলে আছে যাদের জেলে কার্ড আছে কিন্তু চাল পায় নি।খুব সমস্যার মধ্যে দিয়ে তাদের দিন কাটছে।সংসারের এমন অভাব অনটনে  মাছ না ধরে কি করে চলবে।তাই বেশীর ভাগ জেলেই নদীতে মাছ ধরতে যায়।

এদিকে জেলায়  অনিবন্ধিত জেলের সংখ্যাও অনেক।

অনিবন্ধিত জেলে হওয়ায় এ ২ মাাসের  নিষেধাজ্ঞায় কোনো ধরনের সরকারি সহায়তা পাচ্ছে না তারা। ক্ষুদা নিবারণের জন্য বাধ্য হয়েই  মাছ ধরতে যেতে হয় তাদের কে এমনটাই জানান তেঁতুলিয়া নদীর এক জেলে মোঃ সেলিম।

অন্যদিকে মাছ ঘাটগুলোতে দিন দুুপুরে মাছ বেচা কেনায় ব্যস্ত সময় পার করছেন বেশীরভাগ মৎস্য ব্যবসায়ীরা।নিষেধাজ্ঞায় যেন কিছুই আসে যায় না তাদের। প্রশাসনের লোকজন দেখেও যেন দেখে না। এ অভিযানে নদীতে  কিছুটা তৎপরতা থাকলেও মাছ ঘাটগুলোতে কিন্তু  কোনো তৎপরতা লক্ষ্য করা যায় নি। শতশত জেলেকে  গ্রেফতার ও জরিমানা করা হলেও এখন পর্যন্ত কোনো মাছ ব্যবসায়ী আটক অথবা জরিমানা করতে দেখা যায় নি।

এ বিষয়ে মোঃ আলাউদ্দিন নামে এ মাছ ব্যবসায়ী বলেন,জীবিকার তাগিদে মাছ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে তারা।তাদের ও এ কাজ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করার নেই।তাই বাধ্য হয়েই অল্প পরিমানে মাছ বেচা-কেনা করতে হয়।

সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা হয় জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আবুল কালাম আজাদ এর সাথে। তিনি জানান, নিষেধাজ্ঞাকালিন সময়ে যে সব জেলেরা নদীতে মাছ ধরতে যায় তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৪১০ জন জেলেকে আটক করা হয়েছে। এদেরকে বিভিন্ন মেয়াদে জেল জরিমানা করা হয়েছে।এরপরেও মাঝে মাঝে বিভিন্ন জায়গায় নদীতে মাছ ধরার ও মাছ বিক্রির খবর পেয়ে থাকি।তখন সাথে সাথে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহন করার কথা জানান এ কর্মকর্তা।

তিনি আরো জানান, ২ মাসের অভিযানে জেলেদের কোন সহায়তা করা না হলেও জাটকা সংরক্ষণ কর্মসূচীর প্রায় ৮৯ হাজার ৬০০ জেলের জন্য ২ মাসের বরাদ্ধের ৯৩ ভাগ চাল ইতিমধ্যে বিতরণ করা হয়েছে। 

ভোলা জেলায় প্রায় ২ লক্ষাধিক জেলের মধ্যে ১ লক্ষ ৬৫  হাজারের অধিক  নিবন্ধিত জেলে রয়েছে। ২ মাস অভিযান চলাকালে সকল জেলে পরিবার যেন সরকারি বিশেষ সহায়তা পায় তার জন্য জেলেরা দাবী জানান।