ভোলা, সোমবার, ২৪শে ফেব্রুয়ারি ২০২০ | ১২ই ফাল্গুন ১৪২৬

বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক


৫ই ফেব্রুয়ারি ২০২০ রাত ০৯:৩২




চরফ্যাশন বেড়েই চলেছে শিশু জেলেদের সংখ্যা

চরফ্যাসন উপজেলা


এআর সোহেব চৌধুরী, চরফ্যাশন থেকে : ভোলার চরফ্যাশন উপজেলায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমিকের পাশাপাশি বেড়ে চলেছে শিশু জেলেদের সংখ্যা। চরফ্যাশনের উপকূলীয় ও বিচ্ছিন্ন চরাঞ্চলের শিশুরা নদ নদী এবং সাগরে মৎস শিকারে যাচ্ছে জেলেদের সাথে । উপজেলার চায়ের দোকান,হোটেল রেস্তরা,রিক্সা ও অটোরিক্সা, মেকানিক্যাল ওয়ার্কশপ,ওয়েল্ডেং ওয়ার্কশপ,বিল্ডিং নির্মাণ শ্রমিকসহ বিভিন্ন ইটের ভাটায় ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমের পাশাপাশি শিশু জেলের সংখ্যাও বেড়েছে অতি মাত্রায়। এ শিশুদের কাজের ধরন জীবন ও স্বাস্থ্যের জন্য বেশ হুমকি স্বরূপ।
 শিশুদের নিয়ে কাজ করা ব্যাক্তিরা জানান, শিশু শ্রমের প্রধান কারণ হচ্ছে দারিদ্র। অভাবের সংসারের দায়িত্ব নিতে বা নিজের খাবারের জোগান দিতে শিশু কিশোররা শিশু শ্রম তথা ঝুঁকিপূর্ণ কাজেও জরিয়ে পড়ছে। এ শিশুরা কাজ করতে এসে নানা রকমের নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। এমন অবস্থায় প্রশাসনের কোনোও ব্যবস্থা বা শিশু শ্রম বন্ধে কার্যকরি উদ্যোগ না থাকায় দিনদিন শিশু শ্রমের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে বলে জানান কিশোর কিশোরি ক্লাবের একাধিক সদস্য সহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। ১৪শ৪০.০৪ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এ উপজেলার তিন ভাগ এলাকাই নদী বেষ্টিত। এ উপজেলাটি নদী সংলগ্ন এলাকা হওয়ায় এখানকার বিচ্ছিন্ন চর চরাঞ্চলগুলোর ৮০ ভাগ মানুষের পেশা হচ্ছে মৎস শিকার করা। এছাড়াও মৎস আহরনের সিজন না থাকলে এরা কৃষিসহ অন্যান্য পেশায় জরিয়ে পড়ে। এসব জেলেদের সাথে জড়িয়ে পড়ছে শিশুরাও। উপজেলা মৎস কর্মকর্তার দেওয়া তথ্য মতে এ অঞ্চলে ইঞ্জিন চালিত স্থানীয় ট্রলার রয়েছে ৮হাজার ৭শ এবং মোট জেলের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৪১ হাজার। এসব জেলেদের নৌকা ও ট্রলারে শিশু জেলের সংখ্যা প্রায় ১০হাজারের মতো। নৌকায় শিশুরা বাবুর্চির সহকারী অথবা জাল টানা শ্রমিক বা জাল থেকে মাছ বাছাই করা ও মাছ প্রক্রিয়াজত করনে কাজ করে থাকে।  চরফ্যাশন উপজেলার নতুন ¯øুইজ এলাকার জেলেদের সাথে কথা বলে জানা যায়, নদী সংলগ্ন ও চর-চরাঞ্চলের জেলে পল্লীর বেশির ভাগ শিশুরাই পরিবার ও স্বজনদের সাথে নদী ও সাগরে গিয়ে মৎস শিকার করছে। ওই এলাকার জেলে মোঃ সিদ্দিক মিয়া বলেন, নতুন ¯øুইজ এলাকায় প্রায় ২শ ৫০টি ট্রলার রয়েছে এবং প্রায় প্রতিটি ট্রলারেই দুই থেকে তিন জন করে শিশু জেলে রয়েছে। ট্রলার মালিক মাহাবুব বলেন, এখানকার প্রতিটি ট্রলারে প্রায় ৭থেকে ৮শ জেলে শিশু রয়েছে যাদের বয়স ১০ থেকে ১৫ বছরের মতো। এরা প্রতিদিন নদী ও সাগরে যাচ্ছে। এ শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠালে তারা স্কুলে না গিয়ে বিভিন্ন চায়ের দোকানের ক্যারাম বোর্ড ,লুডু জুয়া খেলাসহ ধুমপানেও আসক্ত হয়ে পড়ছে। ফলে পরিবার তাদের বিভিন্ন নৌকা ট্রলারে কাজের জন্য দিয়ে দিচ্ছে। আবার কিছু কিছু শিশুরা সকালে বিদ্যালয়ে গেলেও বিকেলে বাবা বা পাড়ার লোকদের সাথে মাছ শিকারে চলে যায় নদীতে। এছাড়াও অনেক নৌকা মহাজনরা শিশুদের সংসারের অভাবের সুযোগ নিয়ে পরিবার ও স্বজনদেরকে এসব শিশুদের জন্য পাঁচ থেকে দশ হাজার টাকার দাদন দিচ্ছে ফলে এসব দারিদ্র পরিবার শিশুদের ঠেলে দিচ্ছে ঝুঁকিপূর্ণ এ পেশায়। উপজেলার আসলামপুর ইউনিয়নের শিশু জেলে মোঃ আজাদ (১২) ও মোঃ সিদ্দিক (১৫) দুই ভাইয়ের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা ৫হাজার টাকার দাদনে জেলেদের সাথে  মৎস শিকারে যাচ্ছে নদী ও সাগরে। নদীতে মাছ পেলে মহাজনকে শতাংশের আধা ভাগ দিয়ে বাকি ৫০শতাংশের ছয় ভাগের এক ভাগ বিক্রি করে অর্জিত টাকা সংসারে পাঠায়। শিশু জেলে আজাদ (১২) চার মাস ও সিদ্দিক(১৫) তিন বছর ধরে এ পেশায় জড়িয়েছে। শিশু সিদ্দিক পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ালেখা করে সংসারের অভাভে এ পেশাকে বিদ্যালয়ের মতোই মনে করে বলে জানান।
এনজিও সংস্থা কোস্ট ট্রাষ্টের জেলা প্রকল্প সমহ্নয়কারি মিজানুর রহমান বলেন, আমরা বিভিন্ন সেমিনারে নৌকার মালিকদের সাথে কথা বলেছি। যেন শিশুদের নৌকায় না নেওয়া হয়। তাদের দেওয়া ওয়াদা তারা রাখেননা। এবং আমরা ২০১৯ সালে চরফ্যাশনের ঢালচর ও দক্ষিন আইচা থানাসহ মনপুরা, লালমোহন নাজিরপুর ও ভোলা সদরের তুলাতলি এলাকার মৎসঘাট এলাকায় ২৮জন জেলে শিশুকে প্রধান শিক্ষকের সাথে কথা বলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি এবং তাদের বইসহ স্কুলের পোষাক ও বেতন ব্যবস্থা করে দিয়েছি কিন্তু দুর্ভাজ্ঞ ক্রমে তারা দইু থেকে তিন মাস পরে স্কুলে আসা বন্ধ করে দেয়। এর মূল কারন হচ্ছে তারা টাকা উপার্জন করতে পারছেনা।
এবিষয়ে উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা জানান, শিশু শ্রম বন্ধে আমরা বিভিন্ন এলাকায় অভিজান চালালেও এটা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হচ্ছে না। কারন কিছুদিন পর আবার দেখা যাচ্ছে এসব শিশুরা অন্য কোনো পেশায় জড়িয়ে পড়ছে। তার পরেও আমরা এ বিষয়টি নজরদারিতে আনবো।