অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, রবিবার, ২০শে জুন ২০২১ | ৬ই আষাঢ় ১৪২৮


ভোলায় অর্ধলক্ষ লোক পানিবন্ধি


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ২৬শে মে ২০২১ রাত ১০:৫৩

remove_red_eye

১৬০

মনপুরায় বাঁধ ভাঙ্গে লোকালয়  প্লাবিত গাছ চাপায় এক  জন নিহত

বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক ;  ঘুর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলার উপর দিয়ে আজ বুধবার সকাল থেকে থেমে থেমে ঝড়ো বাতাস ও মাঝে মাঝে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হয়েছে। মেঘনা নদীর জোয়ারের পানি বিপদ সীমার ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অস্বাভাবিক জোয়ারের পানির চাপে মনপুরায় ২টি স্থান দিয়ে বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয়ে জোয়ারের পানি প্রবেশ করেছে।  জেলায় প্রায় ২ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। এছাড়াও জেলার দুর্গম অন্তত ৩০টি চরাঞ্চলে প্লাবিত হয়েছে। এতে করে দিনে ও রাতে জোয়ার এলেই প্রায় ৫০ হাজার লোক পানি বন্ধি হয়ে পড়ে। অপর দিকে ভোলার লালমোহন উপজেলায়  আবু তাহের (৪৮) নামে এক কৃষকের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে জেলা প্রশাসক মো: তৌফিক ই-লাহী চৌধুরী ভোলা তুলাতুলি,পূর্ব ইলিশা এলকার  ঝুঁকিপূর্ন বেড়ী বাঁধ পরিদর্শন করেন। এসময় উপস্থিত ছিলেন,সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: মিজানুর রহমান, ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের ডিভিশন-১ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান, ধনিয়া ইউপির চেয়ারম্যান কবির হোসেন, পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাসান মিয়া প্রমুখ।
স্থানীয়রা জানান, মঙ্গলবার রাত সোয়া ৯টার দিকে লালমোহনের কালমা ইউনিয়নের চর কলমি ফরাজি বাজারের কৃষক  আবু তাহের (৪৫) প্রকৃতির ডাকা সারা দিতে ঘরের বাইরে যায়। এসময় ঝড়ো বাতাসে গাছের একটি ঢাল ভেঙ্গে তার নিচে চাপা পড়েন তিনি। এতে তার বুকের পাজর ভেঙ্গে যায়। তাকে গুরুতর অবস্থায় তার স্বজন ও স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে লালমোহন হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু তার অবস্থার অবনতি হলে সেখান থেকে তাকে রাতেই ভোলা সদর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়।  ভোলা সদর হাসপাতালে তাকে আনা হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ১১ টার দিকে তার মৃত্যু হয়েছে।
এদিকে বুধবার সকাল থেকে উত্তাল হয়ে  উঠে মেঘনা নদী। জোয়ারের পানিতে জেলার মনপুরা, চরফ্যাসনের ঢাল চর, কুকুরি মুকরি,চরনিজাম, চর জহিরউদ্দিন, মাঝের চর,মদনপুর, চরপাতিলা, চরজ্ঞান, সোনার চর, কুলাগাজীর তালুক, চর যতিন, চর শাহজালাল, কলাতলীর চরসহ প্রায় ৩০টি নিন্মঞ্চল  ৩-৫ ফুট পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ঘরবাড়ি, রাস্তাসহ বিস্তীর্ন এলাকা ডুবে আছে। ভেসে গেছে পুকুর ও মাছের ঘের। উপকূলে আতংক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই আশ্রয় নিয়েছেন সাইক্লোন সেল্টারে। ভোলা সদরের শিবপুর ইউনয়নের চেয়ারম্যাস জসিম উদ্দিন জানান,তার এলাকায় বেড়ি বাঁধের বাইরে অন্তত অর্ধশত ঘর জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সেখানে জোয়ার এলে পরিবার নিয়ে সাধারণ মানুষ পন্ধিবন্ধি হয়ে পড়ে। এছাড়া রাজাপুর ইউনিয়নের আমির হোসেন জানান, রাজাপুরের বেড়ি বাঁধের বাইরে  কন্দকপুর,রুপা পুর, রামদাসপুরসহ নিন্মাঞ্চল প্লাবিত হয়ে প্রায় ৩ হাজার পরিবার পানি বন্ধি হয়ে পড়ে।  চরফ্যাসন উপজেলার সাগর মোহনার ঢাল চর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুস সালাম জানান, তার ইউনিয়নে প্রায় ৬/৭ শত ঘর বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ভেসে গেছে অসংখ্য পুকুরের মাছ।
এদিকে বুধবার দুপুর ২টায় জোয়ারের তোড়ে মনপুরা উপজেলার মনপুরা ইউনিয়নের কূলাগাজী তালুক গ্রামে নতুন বেড়ীবাঁধের ২০ মিটার ভেঙ্গে যায়। একই সময়ে উপজেলার সাথে দুই ইউনিয়নের পাকা সংযোগ সড়কটি ভেঙ্গে গেছে। এ নিয়ে মোট মনপুরায় দুটি স্থান দিয়ে ৪০ মিটার এলাকা বেড়িবাঁধ ভেঙে গেছে। এছাড়াও জোয়ারের তোড়ে ভেঙ্গে গেছে এলজিইডি নির্মিত ৪০ ফুট পাকা সড়ক। এতে উপজেলার সাথে উত্তর সাকুচিয়া ও দক্ষিণ সাকুচিয়া দুই ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এদিকে ভাঙ্গা বেড়ীবাঁধ ও ভেঙ্গে যাওয়া সড়কে দিয়ে জোয়ারের পানি ডুকে প্লাবিত হয়েছে বিস্তিৃর্ন এলাকা। উপজেলার হাজিরহাট ইউনিয়নের দাসেরহাট, সোনারচর, চরযতিন, চরজ্ঞান, চরমরিয়ম, মনপুরা ইউনিয়নের কূলাগাজী তালুক, কাউয়ারটেক, আন্দিরপাড়, উত্তর সাকুচিয়া ইউনিয়নের আলমনগর ও মাষ্টারহাটের পশ্চিম পাশের নতুন বেড়ীবাঁধের বাহিরে ৪-৫ ফুট জোয়ারের পানিতে প্লাবিত হয়েছে। ওই সমস্ত এলাকায় প্রায় ২০ হাজার মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছে।

ভোলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের তত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বাবুল আক্তার জানান, ভোলার মেঘনা নদীর পানি বিপদ সীমার ৬৭ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়েছে। জেলা মোট ১৫টি স্পট দিয়ে প্রায় ২ কিলোমিটার বেড়ি বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।। এর মধ্যে মনপুরায় ২টি স্থান দিয়ে বাঁধ ভেঙ্গে গেছে। ইতি মধ্যেই বিধ্বস্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত বেড়ি বাঁধ মেরামতের কাজ শুরু হয়েছে।

দৌলতখান প্রতিনিধি জানান, ঘূর্ণিঝড় ইয়াস ও পূণিমার জো’র প্রভাবে ভোলার দৌলতখানে কয়েকটি চরসহ নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পাঁচটি ইউনিয়নের চরাঞ্চল ও বেড়ি বাঁধের বাইরে অবস্থিত অন্তত ২৫ গ্রাম পানির নিচে তলিয়ে গেছে। ভেসে গেছে পুকুর ও ঘেরের মাছ, হাঁস, মুরগী, ছাগল, ভেড়াসহ গৃহস্থালী সামগ্রী। ঘূর্ণিঝড় ইয়াসের প্রভাবে মঙ্গলবার সকাল থেকে মেঘনায় স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে চার-পাঁচ ফুট উচ্চতায় পানি প্রবাহিত হওয়ায় এসব অঞ্চলে জনজীবনে চরম দুর্ভোগ সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়ি বাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। জোয়ারে প্লাবিত হওয়া ইউনিয়নগুলো হচ্ছে, মদনপুর, চরপাতা, ভবানীপুর, সৈয়দপুর ও হাজিপুর ইউনিয়ন। জোয়ার অব্যহত থাকায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমান এখনও নিরুপন করা যায়নি। সৈয়দপুর ইউপি চেয়ারম্যান জিএস ভুট্টো তালুকদার বলেন, তার ইউনিয়নে বেড়ি বাঁধের বাইরের ৬, ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ড জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এসব এলাকার সহশ্রাধিক মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভবানীপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম নবী নবু বলেন, তার ইউনিয়নের ৭ ও ৮ নং ওয়ার্ডে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জোয়ারের চাপে অনেকের বসতঘর বিধ্বস্ত হয়েছে। মধ্য মেঘনায় চর হাজারিতে  গুচ্ছগ্রামের দুই শতাধিক ঘর তলিয়ে গেছে। চরপাতা ইউপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ার হেলাল উদ্দিন বলেন, তার ইউনিয়নের ৫ টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৬ নং ওয়ার্ড সম্পূর্ণ এবং ৪, ৭, ৮ ও ৯ নং ওয়ার্ডের ৮০ শতাংশ অঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। অপরদিকে মধ্যমেঘনায় অবস্থিত মদনপুর ও হাজিপুর ইউয়িনের সব ক’টি ওয়ার্ড জোয়ারের পানিতে তলিয়ে গেছে। এ দুই ইউনিয়নের দুই হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে।

ভোলা জেলা প্রশাসক মো: তৌফিক ই-লাহী চৌধুরী জানান, লালমোহনে গাছ চাপায় নিহত পরিবারকে  ২০ হাজার টাকা অর্থ সহায়তা প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া জোয়ারে প্লাবিত হলে  ঢাল চরে প্রায় ১২ শত লোককে পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রে ও কোস্ট ট্রাস্টে নিরাপদে সরিয়ে আনায় হয়। তাদের মধ্যে শুকনো খাবার বিতরণ করা হয়।