অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শনিবার, ৮ই আগস্ট ২০২৬ | ২৪শে শ্রাবণ ১৪৩৩


দৌলতখান পৌরসভায় অর্থ সংকট নাগরিক সেবা কার্যক্রম বিপর্যস্ত


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ৭ই আগস্ট ২০২৬ রাত ১১:৫৪

remove_red_eye

২৩

উত্তরণে বক্তব্য নিয়ে এমপির বিরুদ্ধে অপপ্রচারের প্রতিবাদে বিএনপির সংবাদ সম্মেলন

নেয়ামত উল্যাহ: ভোলার দৌলতখান পৌরসভায় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা গত ১৪ মাস ধরে বেতন পাচ্ছেন না। দীর্ঘদিনের এই বেতন সংকটে পৌরসভার স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। বর্জ্য অপসারণ, উন্নয়নকাজ, রাজস্ব আদায় এবং নাগরিক সেবার বিভিন্ন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

গত ৫ আগস্টের পর থেকে এই দুরাবস্থা চলে আসলেও কেউ সংকট কাটাতে এগিয়ে আসছে না। এরই মধ্যে পৌরসভার আয় বাড়ানোর বিষয়ে ভোলা-২ আসনের(বোরহানউদ্দিন-দৌলতখান) সংসদ সদস্য হাফিজ ইব্রাহিমের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উল্টো বিভ্রান্তি মূলক গুজব ছড়িয়ে অপপ্রচার করা হয়। কিন্তু সমস্যাসঙ্কটে কেউ এগিয়ে আসে না।

এ অবস্থায় গত বৃহস্পতিবার দুপুরে দৌলতখান উপজেলা ও পৌর বিএনপি নিজস্ব কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করে, সংসদ সদস্যের বক্তব্য বিকৃত করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। তাদের ভাষ্য, এমপি নতুন কোনো কর আরোপের কথা বলেননি; বরং পৌরসভার প্রচলিত রাজস্ব যথাযথভাবে আদায়ের নির্দেশনা দিয়েছেন। হাট, বাজার, স্টান্ড ইজারার কথা বলেছেন। পৌরবাসী ও পৌরসভার কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দৌলতখান পৌরসভার সংকট কেবল রাজনৈতিক বিতর্কের নয়; বরং দীর্ঘদিনের আর্থিক দুর্বলতা, রাজস্ব ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক অকার্যকারিতারও প্রতিফলন। কর্মকর্তা কর্মচারী বেতন না পাওয়ায় সেবা ও সুশাসন ভেঙে পড়ছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি নিজাম উদ্দিন ভুঁইয়া লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন। তিনি বলেন, ২৮ জুলাই পৌরসভার ডিজিটাল সেবা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংসদসদস্য হাফিজ ইব্রাহিম দৌলতখান পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিশ্চিত করতে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, যানবাহনের টোল এবং অন্যান্য বৈধ উৎস থেকে রাজস্ব আদায়ের ওপর গুরুত্ব দেন। কিন্তু একটি মহল বিষয়টিকে 'নতুন কর আরোপ' বা 'চাঁদাবাজির নির্দেশ' হিসেবে প্রচার করছে।

এমনিতেই মাসের পর মাস কর্মকর্তা -কর্মচারী বেতন পাচ্ছে না। সে সমস্যা সমাধান না করে উল্টো সমস্যার মূলে আগুন লাগাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিএনপি নেতারা বলেন, পৌরসভার আয়ের প্রধান উৎস হচ্ছে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স, বাসস্ট্যান্ড ও কাঁচাবাজারের টোল আদায় এবং পানি সরবরাহ বাবদ ফি দেওয়া ।

এছাড়া পৌরসভার নিজস্ব আয়ের বড় কোনো উৎস নেই। তারা আরও জানান, ভবিষ্যতে পৌরসভার সীমানা সম্প্রসারণের মাধ্যমে করের আওতা বাড়ানোর চিন্তাও রয়েছে সংসদসদস্যের। সংবাদসম্মেলন শেষে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা হয়, দৌলতখান পৌরসভার নাগরিক, উপজেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান হাওলাদার,সহ- সভাপতি নিজাম উদ্দিন ভুইয়া, ফারুক হোসেন তালুকদার, আলাউদ্দিন সরদার, যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ফখরুল আলম ট্রপি, পৌর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মো. বসির, ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো.বাবুল, উপজেলা যুবদলের আহবায়ক মাহবুবুর রহমান, সদস্যসচিব আবুহেনা রিয়াজ, উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রাশেদ খানের সঙ্গে।

তাঁরা জানান, একটি পৌরসভায় কর্মকর্তা-কর্মচারী যদি বেতন না পান, তাহলে পৌরসভার নাগরিক সেবা পাবে কীভাবে! যদি সেখানে বৈধ রাজস্ব আদায়ের সুযোগ থেকেই থাকে, তাহলে দীর্ঘ এক-দেড় বছর ধরে কেন কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বকেয়া রয়ে গেল? কেন হোল্ডিং ট্যাক্স, লাইসেন্স নবায়ন ও পৌর ইজারা কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেল না? বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেনো ভেঙে পড়ছে। আর এই আর্থিক সংকট কাটাতে প্রশাসনের সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা কী? সেখানে সংসদসদস্য একটি কার্যকর উপায বাতলে দিয়েছেন। কোনো বাড়তি কর বা চাঁদাবাজিকে উসকে দেওয়া নয়। পৌর নাগরিকরা আরও বলেন, দৌলতখান পৌরসভার সংকট এখন শুধু বেতন বকেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; পৌরসভা অচল হলে সমাজ ব্যবস্থাপনাও ভেঙে পড়বে। ভেঙে পড়বে সুশাসন।

এদিকে এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক আব্দুল মতিন খান স্বীকার করেন, পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন দীর্ঘদিন ধরে বকেয়া রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, পৌরসভার কর্মকর্তা কর্মচারীদের মাসিক প্রায় ১১ লাখ টাকা বেতন ব্যয় হলেও কারও ১৪ মাস, কারও ৮ মাস, আবার কারও ৬ মাসের বেতন বকেয়া রয়েছে। বিশেষ মানবিক কারণে কয়েকজনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বেতন দেওয়া হয়েছে।

প্রশাসক আরও বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের স্বল্প বেতন নিয়মিত দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও অন্য অনেক কর্মচারী নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন না। পৌরসভায় ৪ হাজার খানা বা পরিবার। অনিয়মিত পানি পাচ্ছে মাত্র ৮০০ পরিবার। তারা ঠিকমতো পানির বিল দিচ্ছে না। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য তিনটি মাত্র ভ্যানগাড়ি। ৯ টি ওয়ার্ডে কমপক্ষে নয়টি গাড়ি দরকার। রিকশা, অটোরিকশা স্টান্ড বাসস্টান্ড থেকে কোনো টোল আদায় হচ্ছে না। এসব টোল আদায় বন্ধ আছে। পৌরসভার আয় নেই বললেই চলে। বরাদ্দ আসে নির্ধারিত সড়ক, কালভার্ট উন্নয়নে।

পৌরসভার অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকে রাজস্ব আদায়ে শিথিলতা তৈরি হয়। হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, বাস ও অটোরিকশা স্ট্যান্ডের ইজারা এবং পানির বিল আদায়ে অনিয়ম ও স্থবিরতার কারণে রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন পরিশোধ এবং নাগরিক সেবা পরিচালনায় সংকট আরও প্রকট হয়েছে।

পৌরসভার কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা আরও জানান, একটি পৌরসভার আয় বাড়ানোর একমাত্র উপায় নতুন কর আরোপ নয়। বরং ডিজিটাল হোল্ডিং জরিপ, শতভাগ ট্রেড লাইসেন্স নবায়ন, স্বচ্ছ ইজারা ব্যবস্থা, বকেয়া রাজস্ব আদায়, পৌর সম্পদের বাণিজ্যিক ব্যবহার, পার্কিং ও বিজ্ঞাপন ফি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ফি এবং অনলাইন সেবা চালুর মাধ্যমে রাজস্ব উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে দুর্নীতি ও রাজস্ব ফাঁকি বন্ধে ডিজিটাল লেনদেন ও নিয়মিত অডিটের ওপর গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু দৌলতখান পৌরসভায় এমন উদ্যোগের কেউ নেই।





আরও...