অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, রবিবার, ২১শে জুন ২০২৬ | ৭ই আষাঢ় ১৪৩৩


তারেক রহমানের সফরে কি খুলবে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার?


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২১শে জুন ২০২৬ বিকাল ০৪:১২

remove_red_eye

৩১

দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ থাকা মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য খুলবে কি না, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা চলছে। রোববার (২১ জুন) বিকেলে মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দুই দেশের রিক্রুটিং সিন্ডিকেটের প্রভাব, দুর্নীতি মামলাসহ নানা ইস্যুতে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হওয়া নিয়ে ধোঁয়াশা এখনো কাটেনি। প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে শ্রমবাজার খুলবে কি না সেটি নিয়ে রয়েছে সংশয়।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়ে দফায় দফায় বৈঠকের পরও গত দুই বছরে বাজারটি চালু হয়নি। দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চললেও শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে অগ্রগতি না হওয়ায় রিক্রুটিং এজেন্সি, বিদেশগামী ও মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের নজর এখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সফরের দিকে।

মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রোববার বিকেলে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। এরপর সোমবার বিকেলে তিনি চীনের প্রধানমন্ত্রী লি চিয়াংয়ের আমন্ত্রণে চীন সফরে যাবেন। সফরে মালয়েশিয়া পর্বে বাণিজ্য সম্প্রসারণ, শ্রমবাজারে সহযোগিতা এবং বিনিয়োগের সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রীর মালয়েশিয়া সফরে দুই দেশের মধ্যে সংস্কৃতি ও প্রযুক্তি খাতে অন্তত দুটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

শ্রমবাজার খোলা নিয়ে অনিশ্চয়তা কেন?

প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা বলেন, ২০২৪ সালের মে মাসে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছরের ৫ আগস্টের পর থেকে শ্রমবাজার খোলার জন্য নানাভাবে চেষ্টা করা হয়। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দফায় এজেন্সি সিলেকশন ও সিন্ডিকেটসহ নানা বিষয়ে বৈঠক হয়, কিন্তু কোনো সমাধান আসেনি। তবে এখন নতুন নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যেহেতু মালয়েশিয়া সফরে যাচ্ছেন, তাহলে বাজার খোলার বিষয়ে অবশ্যই আলোচনা হবে। একই সঙ্গে সিন্ডিকেটবিহীন শ্রমবাজার খোলার জন্য জোর দেওয়া হবে।

তারা বলছেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) কিছু ধারা সংশোধনের বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খোলার ব্যাপারে আরও কিছু প্রস্তুতি ও পদক্ষেপ আছে। সেগুলো সময়সাপেক্ষ। আবার এমওইউ লাগবে। এমওইউ সই হওয়ার পর জয়েন্ট টেকনিক্যাল কমিটি শর্তগুলো নিয়ে বসবে। তাই প্রধানমন্ত্রীর এই সফরে মনে হচ্ছে না এসব কিছু এত দ্রুত হবে। তবে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে অনেক অগ্রগতি আসবে আশা করি।এদিকে, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে শ্রমবাজার খোলার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে মনে করছেন না অভিবাসন বিশেষজ্ঞরা।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মালয়েশিয়া সফরে শ্রমবাজার ইস্যুটি অগ্রাধিকার না পেলেও দুই প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে বিষয়টি আলোচিত হবে। বাজার না খুললেও বেশ অগ্রগতি হতে পারে। এরপর বাংলাদেশের মিশন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি নিয়ে ফলোআপ করার সুযোগ পাবে।

তবে শ্রমবাজার পুনরায় চালুর জন্য শুধু উচ্চপর্যায়ের বৈঠক যথেষ্ট নয়; এর আগে প্রয়োজন শক্তিশালী গ্রাউন্ডওয়ার্ক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি। যেটি সম্প্রতি ছিল না বলে মন্তব্য করেন আসিফ মুনীর।

শর্ত আর দুর্নীতির বেড়াজালে আটকে আছে শ্রমবাজার

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় বাংলাদেশ মালয়েশিয়ার কাছে জানতে চেয়েছিল যে, কোন শর্তের ভিত্তিতে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে সীমিত রিক্রুটিং এজেন্সিকে বেছে নেয় এবং কর্মী পাঠানোর অনুমতি দেয়। সে পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়া সরকার ১০টি শর্ত দেয়। তৎকালীন সরকার শর্ত শিথিল করার অনুরোধ করলেও মালয়েশিয়া কোনো জবাব দেয়নি। কিন্তু মালয়েশিয়ার জবাবের অপেক্ষা না করে নিজেদের মতো করে কয়েকটি শর্ত শিথিল করে ৪২৩টি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠায়। 

এছাড়াও বিগত দুই বছরে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো নিয়ে মানবপাচার, অর্থপাচার ও প্রতারণার মামলা হয়েছে বাংলাদেশে। মামলাগুলো কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপর হলেও অদ্যাবধি কোনো সিদ্ধান্ত বা বিচার সম্পন্ন না হওয়ায় মালয়েশিয়া অস্বস্তিকর অনুভূতি প্রকাশ করেছে এবং দ্রুত আইনানুগ নিষ্পত্তি চেয়েছে বলে জানা গেছে।

অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনীর বলেন, মালয়েশিয়া কেন সিন্ডিকেট ধরে রাখতে চায়, সেখানকার কর্মকর্তা বা উচ্চপর্যায়ের লোকদের দুর্নীতি ও অনিয়মে নজর দিতে হবে। আমাদের এখান থেকে তো সবকিছু নিয়ন্ত্রিত হয় না। তারা কেন এসব শর্ত জুড়ে দিয়ে নির্দিষ্ট এজেন্সি থেকে লোক নিতে চায়, এজন্য চাপ দিতে হবে। না হলে এটা কখনো ঠিক হবে না, আমরা শক্ত অবস্থানে না গেলে বাজার এই অবস্থায়ই থাকবে। এজন্য মালয়েশিয়ার কর্তৃপক্ষের সহযোগিতাও অপরিহার্য। সেটা প্রধানমন্ত্রীর সফরে গুরুত্ব দিতে হবে।

সিন্ডিকেটমুক্ত বাজার চায় রিক্রুটিং এজেন্সি

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফর উপলক্ষে দেওয়া শনিবার (২০ জুন) এক স্মারকলিপিতে বাংলাদেশের বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারকে অতীতের মতো কোনো সিন্ডিকেট বা বিশেষ গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে না দিয়ে অন্যান্য শ্রম পাঠানো দেশের মতো সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য উন্মুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স প্রবাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

স্মারকলিপিতে বলা হয়, অতীতে সিন্ডিকেট ব্যবস্থার কারণে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে, শত শত বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি ব্যবসা থেকে বঞ্চিত হয়েছে এবং দুর্নীতি, অনিয়ম ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বৃদ্ধি পেয়েছে। এর ফলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বারবার সংকট ও বন্ধের মুখে পড়েছে।

তারা আরও বলেন, ভবিষ্যতে আবারও সিন্ডিকেট ব্যবস্থা চালু হলে কর্মীদের বিদেশ যাওয়ার খরচ বাড়বে, বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও রেমিট্যান্স বৃদ্ধির লক্ষ্য বাধাগ্রস্ত হবে। তাই সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত, স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক নিয়োগ ব্যবস্থা চালু এবং অভিবাসন ব্যয় কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।