অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, শনিবার, ১৩ই জুন ২০২৬ | ৩০শে জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


অবাস্তব ভিত্তির গতানুগতিক বাজেট: সিপিডি


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১২ই জুন ২০২৬ বিকাল ০৫:১৬

remove_red_eye

৫২

প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে অবাস্তব ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো একটি গতানুগতিক বাজেট বলে আখ্যা দিয়েছে গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির মতে, প্রস্তাবিত বাজেটে আকাঙ্ক্ষা অনেক থাকলেও তা বাস্তবায়নের জন্য বাস্তবসম্মত কোনো সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা নেই।

বরং পুরো বাজেটজুড়েই রয়েছে গতানুগতিকতার ছাপ।

 

শুক্রবার (১২ জুন) সকালে রাজধানীর গুলশানের লেকশোর হোটেলে আয়োজিত ‘জাতীয় বাজেট: সিপিডির পর্যালোচনা’ শীর্ষক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান।

 
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন।

 

বাজেটের ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তুলে ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাস্তবতাকে স্বীকার করে কেন বাজেটের ভিত্তি নির্ধারণ করা হলো না এবং তার ওপর ভিত্তি করে কেন বাজেট প্রণয়ন করা হলো না, তা আমাদের জানা নেই।

নীতিনির্ধারকদের কাছে বিষয়টি নিশ্চয়ই স্পষ্ট ছিল, কিন্তু তারা গতানুগতিকভাবেই বাজেট প্রণয়ন করেছেন।

 

তিনি বলেন, অর্থনীতির চতুর্থ প্রান্তিকের প্রবণতাগুলো বিবেচনায় নিয়ে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলে বাজেট বাস্তবায়ন অনেক সহজ হতো।

এতে সম্পদ আহরণ, রপ্তানি-আমদানি প্রবৃদ্ধি এবং বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের হিসাব আরও বাস্তবসম্মত হতো।

 

নতুন সরকারের সামনে একটি ব্যতিক্রমধর্মী বাজেট উপস্থাপনের সুযোগ থাকলেও তা কাজে লাগানো হয়নি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সেপ্টেম্বরে যখন অর্থনীতির সব চূড়ান্ত হিসাব পাওয়া যাবে, তখন হয়তো আমাদের পেছনে ফিরে ভিত্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে হবে। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধি ছাড়া এ বাজেট কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব নয়। 

বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিবেশ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বাজেটের মূল কাজ সম্পদ আহরণ ও বণ্টন হলেও এর সফল বাস্তবায়ন নির্ভর করে দেশের ব্যবসা পরিবেশ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের ওপর।

তিনি বলেন, বিনিয়োগে যতই শুল্ক ছাড় বা প্রণোদনা দেওয়া হোক না কেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত না হলে তা কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না। বিনিয়োগ বেসরকারি খাত করলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্রের।

স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বরাদ্দ বাড়লেও তা ব্যবহারের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে সিপিডি। ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে ‘গুড ভ্যালু ফর মানি’ অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি ও সংস্কারের প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাজেটে সে বিষয়ে যথেষ্ট গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, কারিগরি শিক্ষার প্রসার কিংবা নতুন ভাষা শেখানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও এক বছরের মধ্যে তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষক, অবকাঠামো ও সক্ষমতা তৈরির কোনো সুস্পষ্ট রূপরেখা বাজেটে নেই।

এসএমই খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, প্রস্তাবিত বাজেটে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) জন্য কিছু সুবিধা রাখা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে বন্ড সুবিধা এবং ব্যাংক গ্যারান্টির ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়।

তিনি বলেন, এ কারণে বাজেটকে পুরোপুরি বড় শিল্পবান্ধব বা এসএমই-বিরোধী বলা যাবে না। তবে এসএমই ফাউন্ডেশন ও স্টার্টআপ ফান্ডের মাধ্যমে তরুণদের স্বকর্মসংস্থানের সুযোগ বাস্তবায়নে প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। 

কর্মসংস্থান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ শিল্প-কারখানার পাশাপাশি বৈদেশিক শ্রমবাজারের প্রতিও গুরুত্ব দিতে হবে।

রেমিট্যান্স এখন অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। প্রতি বছর ২০ থেকে ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করলেও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ পাচ্ছেন গড়ে ১০ লাখ। তাই দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়ে বাজেটে আরও বিস্তৃত পরিকল্পনা থাকা উচিত ছিল, বলেন তিনি।

কালো টাকা সাদা করার সুযোগ ‘নৈতিক অবক্ষয়’

বিনা প্রশ্নে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়ার তীব্র সমালোচনা করেছে সিপিডি। সংস্থাটির মতে, এ উদ্যোগ অর্থনৈতিকভাবে যৌক্তিক নয়, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং রাজনৈতিকভাবেও ইতিবাচক বার্তা দেয় না।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, এ ধরনের সুযোগ দিয়ে সরকারের উল্লেখযোগ্য রাজস্ব আয় হয় না। বরং নিয়মিত করদাতারা নিরুৎসাহিত হন। এটি সমাজে একটি নৈতিক ঝুঁকি বা ‘মোরাল হ্যাজার্ড’ তৈরি করে।

তিনি বলেন, মৌজা মূল্যের বৈষম্যের কারণে সরকার হয়তো জমি বা ফ্ল্যাট কেনাবেচার ক্ষেত্রে শেষবারের মতো এ সুযোগ দিয়েছে বলে ধারণা করা যেতে পারে। তবে নীতিগতভাবে সিপিডি এর তীব্র বিরোধিতা করে।

বৈদেশিক ঋণের ঝুঁকি নিয়ে সতর্ক করে সিপিডি বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র বা জাপানের জিডিপির সঙ্গে তুলনা করে বাংলাদেশের ঋণ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করা সঠিক হবে না। মূল প্রশ্ন হলো, ঋণ পরিশোধের জন্য পর্যাপ্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও সক্ষমতা রয়েছে কি না।

ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আইএমএফও সম্প্রতি তাদের মূল্যায়নে বাংলাদেশকে ‘লো রিস্ক’ থেকে ‘মিডিয়াম রিস্ক’ ক্যাটাগরিতে স্থান দিয়েছে।

তিনি বলেন, পাঁচ-ছয় বছর আগেও বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে বছরে ৩ থেকে সাড়ে ৩ বিলিয়ন ডলার ব্যয় হতো। এখন সেই পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। অনেক বড় প্রকল্পের গ্রেস পিরিয়ড শেষ হয়ে যাওয়ায় এখন সুদ ও আসল একসঙ্গে পরিশোধ করতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, অন্যদিকে, মেগা প্রকল্পগুলোর আয় হচ্ছে টাকায়। প্রস্তাবিত বাজেটে ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হার ১২৬ থেকে ১২৭ টাকা ধরা হয়েছে। টাকার অবমূল্যায়নের ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ আরও বাড়বে এবং তা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

অনুষ্ঠানে সিপিডির সিনিয়র রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হেলেন মাসিয়াত প্রিয়তিসহ সংস্থাটির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।