অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, মঙ্গলবার, ২৬শে মে ২০২৬ | ১২ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


লন্ডন থেকে ফিরে গড়েছেন খামার, ৯ গরু থেকে এখন ১০৫


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬শে মে ২০২৬ বিকাল ০৪:৩৫

remove_red_eye

৪৩

উচ্চ শিক্ষা শেষে করপোরেট চাকরি বা বিদেশে স্থায়ী হওয়ার স্বপ্ন অনেকেরই থাকে। তবে সেই প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে ব্যতিক্রমী পথ বেছে নিয়েছেন বগুড়ার তরুণ উদ্যোক্তা ও আরকে অ্যাগ্রো ফার্মের স্বত্বাধিকারী রাহাত খান।

লন্ডনে উচ্চ শিক্ষা শেষ করে দেশে ফিরে চাকরির পেছনে না ছুটে তিনি গড়ে তুলেছেন আধুনিক গরুর খামার। শখ থেকে শুরু হওয়া সেই উদ্যোগ এখন সফল একটি ফার্মে পরিণত হয়েছে।
 

বগুড়া সদর উপজেলার ধাওয়াকোলা গ্রামে রাহাতের বাড়ি। চণ্ডীহারায় প্রায় ৪০ বিঘা জমির ওপর গড়ে উঠেছে আর কে অ্যাগ্রো ফার্ম লিমিটেড।

মাত্র আট-নয়টি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে খামারে রয়েছে প্রায় ১০৫টি গরু। পাশাপাশি ছাগল ও ভেড়াও পালন করা হয়।
শুধু পশু মোটাতাজাকরণ নয়, বীজ ও বাচ্চা উৎপাদনের কাজও হচ্ছে সেখানে।

 

রাহাত খান বলেন, আমি ইংল্যান্ড থেকে ল এবং বিজনেসে মাস্টার্স করেছি। আমি মনে করি, কোনো পেশাই ছোট নয়। হালালভাবে যে রোজগার করা যায়, সেই সব পেশাই সম্মানের।
বর্তমানে তার খামারে শাহিওয়াল, সিন্ধি, গির, ব্রাহমা, অংগোল, ফ্রিজিয়ান ও ভুট্টি জাতের গরু রয়েছে। কোরবানির বাজারকে সামনে রেখে বিভিন্ন জাতের গরু প্রস্তুত করা হয়।

রাহাত জানান, শুরুটা সহজ ছিল না। নতুন ব্যবসা, গরুর রোগবালাই ও পরিচর্যার নানা বিষয় ধীরে ধীরে শিখতে হয়েছে। 

তিনি বলেন, প্রথমে মাত্র নয়টি গরু দিয়ে যাত্রা শুরু করি। পরে অভিজ্ঞতা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে ধীরে ধীরে খামার সম্প্রসারণ করেছি।

খামারে আসার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেন, মূলত শখ থেকেই শুরু। ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে আজ এই পর্যায়ে এসেছি।

খামারের শুরুর দিনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, পড়াশোনা করেছি, কিন্তু কখনও ভাবিনি খামার করব। শুরু থেকেই কিছু লোক ছিল। তবে আমি নিজেও গরুর দেখাশোনা করতাম, খাবার খাওয়াতাম।  
রাহাত বলেন, খামারে নামার সিদ্ধান্তে শুরুতে পরিবারের সমর্থন ছিল না। প্রথমে কেউই বিষয়টা পছন্দ করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে সফলতা আসতে শুরু করলে সবার ভালোবাসা পেয়েছি। বন্ধুদের প্রতিক্রিয়াও ছিল মিশ্র। 

তিনি বলেন, অনেকে বলত, এত পড়াশোনা করে এখানে কেন? কেউ কেউ চাষা বলেও কটু কথা বলেছে। তবে অনেক বন্ধু উৎসাহও দিয়েছে।

ইংলিশ মিডিয়াম ব্যাকগ্রাউন্ড ও বিদেশি ডিগ্রি নিয়ে খামারে কাজ করায় শুরুতে অনেকে ভিন্নভাবে দেখলেও এখন সেই দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে বলে জানান তিনি।

রাহাতের ভাষায়, সফলতার পরে সবাই ইতিবাচকভাবে নিয়েছে। আসলে কোনো পেশাই ছোট নয়। যে কাজ ভালোবেসে করা যায়, সেই কাজেই সফল হওয়া সম্ভব।

তিনি বলেন, করপোরেট চাকরিকে নিরাপদ জীবন মনে করেন অনেকেই। কিন্তু ব্যবসায়ও ভালো কিছু করা সম্ভব। ব্যবসায় ঝুঁকি থাকে, লোকসানও হয়। তবে এখান থেকেও ভালো কিছু করা সম্ভব

রাহাতের স্ত্রী রুমাইয়া তাসনিমও পেশায় ব্যারিস্টার। কৃষক পরিচয় নিয়ে কোনো সংকোচ নেই জানিয়ে রুমাইয়া বলেন, আগে অনেকে ভিন্নভাবে দেখত, এখন আর কেউ কিছু বলে না।

বিদেশে পড়াশোনার অভিজ্ঞতা খামার পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলেও মনে করেন রাহাত। তিনি বলেন, লন্ডন আর বাংলাদেশের ব্যবসায়িক পরিবেশ ভিন্ন। তবে সেখানে থাকাকালীন যা শিখেছি, তা আমার সফলতার সিঁড়ি হিসেবে কাজ করেছে।

রাহাত আরও বলেন, খামার ব্যবসার সবচেয়ে কঠিন সময় ছিল শুরুর কয়েক বছর। ২০১৫-১৬ সালের সময়টা খুব প্রতিকূল ছিল। কখন গরু বিক্রি করব, কোনটার দাম কেমন হবে এসব নিয়ে দ্বিধায় থাকতাম। এখন দীর্ঘদিন কাজ করার কারণে অভিজ্ঞতা হয়েছে।

প্রথম লাভের অনুভূতির কথাও তুলে ধরে রাহাত। প্রথম লাভের টাকা হাতে পেয়ে খুব ভালো লেগেছিল। তবে লস করেই শিখতে হয়। শুরুর দিকে ক্ষতির মুখোমুখি হলেও এখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো অবস্থানে আছি।

বর্তমানে তার খামারের গরুর দাম ৩ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত। কিছু পশুর মূল্য ১৫ লাখ, ২২ লাখ এমনকি ৪০ লাখ টাকাও ছাড়িয়েছে। কোরবানির বাজারকে সামনে রেখে ১৭টি গরু প্রস্তুত করা হয়েছিল, যার মধ্যে ইতোমধ্যে কয়েকটি বিক্রি হয়েছে।

খামারের পশু শুধু স্থানীয় বাজারেই নয়, মোবালফোন ও পরিচিতির মাধ্যমেও বিক্রি হচ্ছে। বগুড়া ছাড়াও ঢাকা ও চট্টগ্রামের ক্রেতাদের কাছেও যাচ্ছে এসব গরু।

খামারের শ্রমিক সাইফুল ইসলাম জানান, গত পাঁচ বছর ধরে তিনি এই খামারে কাজ করছেন। প্রতিদিন সকাল থেকেই শুরু হয় তাদের ব্যস্ততা।

তিনি বলেন, সকালে এসে প্রথমে খামার পরিষ্কার করি। এরপর গরুগুলোকে খাবার দিই। দুপুরের দিকে আবার ঘাস কেটে প্রস্তুত করি। প্রতিদিন দুপুর ১২টার দিকে গরুগুলোকে গোসল করানো হয়। এরপর বিকেল ৫টার দিকে আবার খাবার দেওয়া হয়।

তিনি আরও বলেন, প্রতিদিন গরুগুলোর শারীরিক অবস্থাও পর্যবেক্ষণ করা হয়। কোনো গরুর সমস্যা দেখা দিলে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়।

সংসারের প্রসঙ্গে সাইফুল বলেন, আল্লাহ যেটুকু দেন, তা নিয়েই আলহামদুলিল্লাহ ভালোভাবে চলে যায়। আমাদের সাহেবও অনেক সুবিধা দেন। যেকোনো সমস্যায় পাশে দাঁড়ান।

খামারের ম্যানেজার আব্দুল বারী বলেন, দীর্ঘ ১২ বছর ধরে তিনি এই খামারে দায়িত্ব পালন করছেন এবং খামারেই বসবাস করেন।

তিনি বলেন, খামারে মোট চারজন কাজ করি। ২৪ ঘণ্টাই গরুগুলোর দেখভাল করতে হয়। কোন গরুকে কীভাবে খাবার দিতে হবে, কোন গরুর কী সমস্যা সবকিছু তদারকি করতে হয়।

আব্দুল বারী জানান, বর্তমানে খামারে শাহিওয়াল, ফ্রিজিয়ান, কাঙ্গাল, ভুট্টি ও আমেরিকান ব্রাহমা জাতের গরু রয়েছে। এসব গরুর মধ্যে ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে ৮ লাখ, ১০ লাখ, ২২ লাখ এমনকি ৪০ লাখ টাকা মূল্যের গরুও রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, অনেক সময় মোবাইল ফোনের মাধ্যমেই গরু বিক্রি হয়ে যায়। পরে আমরা ক্রেতার কাছে গরু পৌঁছে দিই। আজই ১৩ লাখ টাকার দুটি গরু বিক্রি হয়েছে।