অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, মঙ্গলবার, ২৬শে মে ২০২৬ | ১২ই জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩


হামের থাবায় পাহাড়েও মরছে শিশু


বাংলার কণ্ঠ ডেস্ক

প্রকাশিত: ২৬শে মে ২০২৬ বিকাল ০৪:৩৩

remove_red_eye

৩৯

সারা দেশের মতো প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা পার্বত্য জেলা বান্দরবানের আলীকদম উপজেলা ও লামা উপজেলার দুর্গম পাহাড়ি জনপদগুলোতে হামের প্রকোপে ঝরছে প্রাণ। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ দাবি করছে, পরিস্থিতি আগের চেয়ে কিছুটা স্থিতিশীল হয়েছে।

তবে স্থানীয়দের ভাষ্য, পাহাড়ের ভেতরে এখনও আতঙ্ক কাটেনি। বিশেষ করে শিশুদের মধ্যে জ্বর, শরীরে লালচে দানা, দুর্বলতা ও কাশির উপসর্গ নিয়ে নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
 

 

বর্তমানে আলীকদম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে হামের উপসর্গ নিয়ে ৫১ জন রোগী ভর্তি রয়েছে। তাদের মধ্যে অন্তত ১২ জন শিশু।

অন্যদিকে লামায় ১৩ জন রোগীর মধ্যে তিন শিশুর বয়স যথাক্রমে ১০, ১১ ও ১৩ বছর। স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবি, প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ অনেক রোগী দুর্গম পাহাড়ি পাড়াগুলোতে চিকিৎসাবিহীন অবস্থায় পড়ে আছে।

 

স্থানীয়রা বলছেন, পাহাড়ের এই সংকট দেশের মূলধারার সংবাদের শিরোনামে কিংবা আলোচনায় সেভাবে উঠে আসছে না।

এক পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু
রূপসী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ছলম পাড়ায় এখনও শোকাবহ পরিবেশ। কয়েকদিনের ব্যবধানে এখানে হামের উপসর্গ নিয়ে একই পরিবারের দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে।

৭ বছরের সংছাই ম্রো প্রথমে জ্বরে আক্রান্ত হয়। পরে শরীরে লালচে দানা দেখা দেয়। পরিবারটি প্রথমে স্থানীয় ঘরোয়া চিকিৎসার ওপর নির্ভর করে। কয়েকদিন পর একই উপসর্গ দেখা দেয় সংছাই ম্রোর এক বছর বয়সী ছোট ভাই মেনলেক ম্রোর শরীরেও।

স্থানীয় ছাত্রী প্রতিনিধি ক্রইঙই ম্রো বলেন, ‘পাহাড়ে হাসপাতালে যেতে অনেক সময় লাগে। অনেকে ভয়ও পায়। তাই প্রথমে ঘরোয়া চিকিৎসাই করে।’

হামের থাবায় পাহাড়েও মরছে শিশু

পরিবারটি প্রথমে ৫ মে শিশু দুটিকে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করায়। সেখানে একদিন চিকিৎসা দেওয়ার পর তাদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে রেফার করা হয়। প্রায় দুই সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থাকার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরিবারটি নিজ দায়িত্বে শিশুদের বাড়িতে নিয়ে আসে।

‘মরলেও বাড়িতে মরবে, বাঁচলেও বাড়িতেই বাঁচবে’ –এ কথা বলেই শিশু দুটির মা চামলে ম্রো সন্তানদের নিয়ে বাড়ি ফেরেন। ১৯ মে মারা যায় ৭ বছরের সংছাই ম্রো আর পরদিন ২০ মে মৃত্যু হয় এক বছর বয়সী মেনলেক ম্রোর।

দুই ভাইবোনের মৃত্যুর পর পুরো পাড়ায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। অনেক পরিবার এখন শিশুদের জ্বর হলেই ভয় পাচ্ছে।

১১ মাসের তুম পয় ম্রোও হার মানলো
দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের পুমনাও পাড়ার বাসিন্দা তন ওয়াই ম্রো ও সংলিউ ম্রোর প্রথম সন্তান, ১১ মাস বয়সী তুম পয় ম্রো কয়েকদিনের জ্বর ও শরীরে দানা নিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে। প্রথমে পরিবার বিষয়টি গুরুত্ব না দিলেও পরে অবস্থার অবনতি হলে তাকে দীর্ঘ পাহাড়ি পথ পাড়ি দিয়ে লামা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়।

সেখানে অবস্থার আরও অবনতি হলে শিশুটিকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। সেখানে এক সপ্তাহ মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করার পর মারা যায় তুম পয় ম্রো।

স্থানীয়দের ভাষায়, দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনও অনেক পরিবার মনে করে হাম ‘স্বাভাবিকভাবে বের হয়ে গেলে’ রোগ সেরে যায়। ফলে প্রাথমিক অবস্থায় চিকিৎসাকেন্দ্রে না গিয়ে অনেকেই স্থানীয় টোটকা ব্যবহার করে।

১৪ জনের মৃত্যুর তালিকা ঘিরে আতঙ্ক
স্থানীয় সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, গত এপ্রিল থেকে মে মাস পর্যন্ত হামের উপসর্গ ও এ সংক্রান্ত জটিলতায় অন্তত ১৪ জনের মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে, যাদের অধিকাংশই শিশু।

মৃতদের মধ্যে রয়েছে— সংরুং ম্রো (৩ মাস), রিংলত পাড়া, কুরুকপাতা - ১২ এপ্রিল; খতং ম্রো (৭ মাস), রিংলত পাড়া, কুরুকপাতা - ১২ এপ্রিল; তুম মুম ম্রো (৮), রুইতন পাড়া - ২২ এপ্রিল; য়ংরাও ম্রো (৮), য়ংএ পাড়া - ২৬ এপ্রিল; তাংতুই ম্রো (১১), রুইতন পাড়া - ২ মে; তুমরাও ম্রো (১), মেন রুয়া পাড়া - ১৪ মে; সংপ্রং ম্রো (১৮), ভেওলা পাড়া - ১৫ মে; লিম পাও ম্রো (২৫), বালুঝিরি - ১৮ মে; তুম পয় ম্রো (১১ মাস), পুমনাও পাড়া - ১৯ মে; সংছাই ম্রো (৭), ছলম পাড়া, লামা - ২০ মে; তুম য়েন ম্রো (১০ মাস), দড়ি পাড়া - ২০ মে; মেন লেং ম্রো (১), ছলম পাড়া, লামা - ২১ মে; থোই য়ং ম্রো (৪৫), রেংবক পাড়া - ২২ মে (কলেরায় আক্রান্ত); রুম পাও ম্রো (১৬), তন রাও পাড়া - ২৩ মে।

স্থানীয়দের দাবি, দুর্গম এলাকার অনেক মৃত্যু এখনও আনুষ্ঠানিক তালিকার বাইরে রয়ে গেছে।

চার ইউনিয়নের মধ্যে নতুন আতঙ্ক নয়াপাড়া
স্থানীয় সূত্র জানায়, আলীকদম উপজেলার চারটি ইউনিয়নের মধ্যে কুরুকপাতা এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা কিছুটা কমলেও বর্তমানে ৩ নম্বর নয়াপাড়া ইউনিয়নে নতুন করে রোগী বাড়তে শুরু করেছে।

দুর্গম পাহাড়ি পথ, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা এবং স্বাস্থ্য সচেতনতার অভাবের কারণে নতুন আক্রান্তদের দ্রুত শনাক্ত করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।

স্থানীয় সংগঠন ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন বলছে, এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানুষকে কুসংস্কার থেকে বের করে এনে চিকিৎসা ও টিকাদানের আওতায় আনা।

হামের থাবায় পাহাড়েও মরছে শিশু

‘শুকরের পায়খানা পুড়িয়ে খেলে হাম সারে’
দুর্গম পাহাড়ি এলাকাগুলোতে এখনও হামের চিকিৎসা নিয়ে নানা ধরনের লোকবিশ্বাস প্রচলিত রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষায়, কেউ কেউ বিশ্বাস করেন শুকরের পায়খানা শুকিয়ে পুড়িয়ে পানির সঙ্গে মিশিয়ে পান করলে শরীর থেকে ‘রোগ বের হয়ে যায়’।

অনেকে মনে করেন, এটি পান করার পর বমি হলে রোগ সেরে ওঠে। তবে এ ধারণাকে বিপজ্জনক বলে মনে করছেন স্থানীয় সংগঠকরা।

ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশন সভাপতি সেথং ম্রো বলেন, ‘এ ধরনের কোনো চিকিৎসার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। বরং এতে রোগীর অবস্থা আরও খারাপ হতে পারে। আমরা মানুষকে বোঝানোর চেষ্টা করছি যাতে তারা এসব ঘরোয়া টোটকার ওপর নির্ভর না করে দ্রুত হাসপাতালে যায়।’

তিনি জানান, অনেক পরিবার এখনও প্রথমে স্থানীয় ওঝা বা বয়স্কদের পরামর্শ নেয়। ফলে সময় নষ্ট হয়। পরে রোগীর অবস্থা গুরুতর হয়ে গেলে হাসপাতালে আনা হয়।

তার ভাষায়, ‘আমরা সার্বক্ষণিকভাবে দুর্গম পাড়াগুলোতে গিয়ে মানুষকে সচেতন করার চেষ্টা করছি। টিকা নেওয়ার জন্যও উৎসাহ দিচ্ছি।’

লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি টিকাদান
হামের বিস্তার ঠেকাতে বর্তমানে স্বাস্থ্য বিভাগ, স্থানীয় প্রশাসন, সেনাবাহিনী, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় সংগঠনগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।

ম্রো ইয়ুথ অর্গানাইজেশনের সদস্যরা বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলছেন, টিকা সম্পর্কে ভুল ধারণা দূর করার চেষ্টা করছেন এবং আক্রান্তদের হাসপাতালে আনতে সহায়তা করছেন।

আলীকদম উপজেলায় চলমান টিকাদান ক্যাম্পেইনের মোট লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ২৭৮ জন। ২৫ মে ২০২৬ পর্যন্ত সেখানে টিকা পেয়েছে ৮ হাজার ৬৪১ জন, যা নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি।

এর মধ্যে শুধু কুরুকপাতা ইউনিয়নেই লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮৩৮ জন, সেখানে টিকা দেওয়া হয়েছে ৮৫৪ জনকে। এছাড়া ৫ থেকে ১৫ বছর বয়সী মোট ২ হাজার ২৪১ শিশুকে টিকার আওতায় আনা হয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর অনেক পরিবার আগে টিকা নিতে অনাগ্রহী ছিল। কেউ কেউ ভয় পেত শিশু অসুস্থ হয়ে যাবে। আবার অনেক জায়গায় স্বাস্থ্যকর্মীরাও নিয়মিত পৌঁছাতে পারেননি।

বর্তমানে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করেছে। বিভিন্ন পাড়ায় গিয়ে স্বাস্থ্যকর্মীরা শিশুদের টিকা দিচ্ছেন এবং মাইকিং করে সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা চলছে।

‘শেষ পর্যায়ে হাসপাতালে আসে’
স্থানীয় সংবাদকর্মী সুশান্ত তংচঙ্গ্যা বলেন, কয়েক সপ্তাহ আগের তুলনায় কুরুকপাতা এলাকায় আক্রান্তের সংখ্যা কমেছে। তবে নতুন করে নয়াপাড়া ইউনিয়নে রোগী বাড়ছে।

তিনি বলেন, ‘দুর্গম এলাকায় মানুষ এখনও প্রথমে ঘরোয়া চিকিৎসা করে। পরে যখন রোগীর অবস্থা খারাপ হয় তখন হাসপাতালে নিয়ে আসে।’

বান্দরবানের স্বাস্থ্য বিভাগ জানিয়েছে, সরকারি হিসাবে জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে দুইজনের মৃত্যুর তথ্য রয়েছে। তবে স্থানীয় সংগঠনগুলোর দাবি, দুর্গম পাড়াগুলোতে অনেক মৃত্যু এখনও আনুষ্ঠানিক হিসাবের বাইরে থেকে যাচ্ছে।

বান্দরবানের সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ শাহীন হোসাইন চৌধুরী বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন দুর্গম এলাকায় মেডিকেল টিম পাঠিয়ে চিকিৎসাসেবা ও টিকাদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছি। মানুষকে দ্রুত হাসপাতালে আসতে হবে।’

পাহাড়ের এই মৃত্যু কতটা দৃশ্যমান
স্থানীয়দের অভিযোগ, পার্বত্য অঞ্চলের স্বাস্থ্য সংকট জাতীয়ভাবে খুব কম আলোচনায় আসে। ফলে প্রতিরোধযোগ্য রোগেও পাহাড়ি শিশুদের মৃত্যু অনেক সময়ই আড়ালে থেকে যায়।

সংছাই ম্রো আর মেনলেক ম্রোর ছোট দুটি কবর এখন পাহাড়ের সংকটের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। পাহাড়ের গভীরে ঘটে যাওয়া এই মৃত্যুগুলো হয়ত জাতীয় পরিসংখ্যানে খুব ছোট সংখ্যা, কিন্তু প্রতিটি পরিবারের জন্য তা একেকটি পৃথিবী ভেঙে পড়ার গল্প।