অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, মঙ্গলবার, ২৩শে এপ্রিল ২০২৪ | ৯ই বৈশাখ ১৪৩১


লালমোহনে এক শতাব্দীরও অধিক সময় ধরে সংঘবদ্ধ ‘চিলার গোষ্ঠী’


লালমোহন প্রতিনিধি

প্রকাশিত: ১১ই মার্চ ২০২৪ সন্ধ্যা ০৭:৩৫

remove_red_eye

৩৫

লালমোহন প্রতিনিধি : ভোলার লালমোহন উপজেলায় প্রায় ১২৫ বছর যাবত সংঘবদ্ধভাবে বসবাস করছেন ‘চিলার গোষ্ঠী’ নামে এক জনগোষ্ঠী। এই গোষ্ঠীর আদি নিবাস ছিল নোয়াখালীর চর জুবলীতে। নদী ভাঙনের কারণে নোয়াখালী থেকে তৎকালীন শাহবাজপুরের বুড়িরধোন এবং বর্তমান লালমোহন উপজেলার লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নে চলে আসেন। তখন থেকে প্রায় ১২৫ বছর ধরে চিলার গোষ্ঠীর মানুষজন ঐক্যবদ্ধভাবে এখানে বসবাস করছেন।  

চিলার গোষ্ঠীর সদস্য ও লর্ডহার্ডিঞ্জ ফাজিল মাদরাসার সহকারী শিক্ষক মো. ফখরুল আলম একলাছ জানান, আমাদের পূর্ব পুরুষদের বাড়ি ছিল নোয়াখালী জেলার চর জুবলীতে। সেখান থেকে ১৯০০ সালের দিকে নদী ভাঙনের কারণে আমাদের পূর্ব পুরুষরা তৎকালীন শাহবাজপুর চরে চলে আসে। আমাদের গোষ্ঠীর লোকজনকে চিলার গোষ্ঠী বলা হয়। এই নামকরণের পেছনে রয়েছে এক অদ্ভূত কাহিনী। মূলত তখন চরজুবলীতে সিইউ ড্যাব (ভূমি কর্মকর্তা) জমি বন্দোবস্ত দিতে আসেন। তিনি আমাদের বাড়িতে আসার পর বাড়ির গাছে একটি চিল বসে থাকতে দেখেন। তখন ওই কর্মকর্তা চিল দেখে আমাদের বাড়িকে বলেন ‘চিলার বাড়ি’। সেই থেকে আমাদের বাড়ির নাম হয়ে যায় চিলার বাড়ি। পরে নদী ভাঙনের কারণে ভোলার লালমোহন উপজেলার তৎকালীন শাহবাজপুর চরে চিলার বাড়ির লোকজন চলে আসেন। বর্তমানে এ জনপদ লর্ডহার্ডিঞ্জ হিসেবে পরিচিত। এখানে এসে তারা সব সময় ঐক্যবদ্ধ ছিল। তখন একত্রে ২০টি পরিবার এখানে আসে। এই এলাকায় আসার পর বাহিরের কেউ চিলার বাড়ির লোকজনের ক্ষতি করার চেষ্টা করলে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে তা মোকাবিলা করতো। সেই থেকে এখানে আমাদের গোষ্ঠীর সদস্যদের নাম দেওয়া হয় ‘চিলার গোষ্ঠী’। এখনও আমরা চিলার গোষ্ঠী নামেই পরিচিত। 

তিনি জানান, বর্তমানে এখানে প্রায় একশত পরিবার রয়েছে। চিলার গোষ্ঠীর বর্তমানে ভোটারের সংখ্যা সাত শতাধিক। এখনো আমরা সু-সংগঠিত, সুসংহত এবং সাহসী। আমরা কখনো অন্যায় করতাম না এবং অন্যায়কে প্রশ্রয়ও দিতাম না। এজন্য সকলেই আমাদেরকে ভালোবাসতেন-শ্রদ্ধা করতেন। ভয় পেতো অন্যায়কারীরা। আমাদের গোষ্ঠীর সকল পরিবারই কম-বেশি স্বচ্ছল। লর্ডহার্ডিঞ্জ আসার পর থেকে আমরাই এই এলাকার নেতৃত্ব দিচ্ছি। আমাদের চিলার গোষ্ঠীর রকবত আলী মিয়া ছিলেন তৎকালীন এখানকার প্রেসিডেন্ট। এরপর শুরু হয় মাইজ্জা মিয়ার প্রচলন। যারা এলাকায় বিচার-শালিস করতেন। তখনও আমাদের গোষ্ঠীর নূর মোহাম্মদ মিয়া ছিলেন মাইজ্জা মিয়া। এরপর আসে ইউনিয়ন পরিষদের প্রচলন। ইউনিয়ন পরিষদেও সদস্য হন চিলার গোষ্ঠীর আব্দুল হাই মিয়া ও আবুল কাশেম মিয়া।

চিলার গোষ্ঠীর সদস্য ও মাদরাসার শিক্ষক ফখরুল আলম একলাছ আরো জানান, বর্তমানে লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে সদস্য হিসেবে রয়েছেন আমাদের চিলার গোষ্ঠীর মো. শাহাদাত হোসেন। বিগত ৪৫ বছর ধরে আমাদের গোষ্ঠীর মধ্য থেকেই ইউপি সদস্য নির্বাচিত হচ্ছেন। বিভিন্ন নির্বাচনে আমরা সকলে মিলে নির্ধারণ করি পরবর্তীতে কে নির্বাচন করবেন। এবং তার জয় নিশ্চিতের লক্ষ্যে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করি। এছাড়া আমাদের চিলার গোষ্ঠীর সব সদস্যরা একমূখী হওয়ায় অন্যান্য প্রার্থীরাও আমাদের কাছে ভোট চাইতে ছুটে আসেন।

চিলার গোষ্ঠীর সদস্য ও বর্তমান লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. শাহাদাত হোসেন বলেন, আমাদের চিলার গোষ্ঠীর প্রবীণরা এলাকায় বিভিন্ন মসজিদ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরিতে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। বর্তমানে আমাদের এই গোষ্ঠীর  মধ্যে রয়েছেন- সরকারি চাকরিজীবী, অধ্যাপক, শিক্ষক, রাজনৈতিক নেতা, প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী এবং কৃষকসহ বিভিন্ন পেশাজীবী। আমরা সকলে এখনো ঐক্যবদ্ধ রয়েছি। আমাদের গোষ্ঠীর বিভিন্ন বিপদে-আপদে পাশে থাকতে আমরা প্রতিষ্ঠা করেছি ‘চিলার গোষ্ঠী ঐক্য পরিষদ’। এই সংগঠনের ফান্ডে অন্তত ১৬ লাখ টাকা রয়েছে। এসব টাকা চিলার গোষ্ঠীর কোনো পরিবারের সদস্য বিপদগ্রস্ত এবং অসুস্থ হয়ে পড়লে সহযোগিতা হিসেবে দেওয়া হয়। আমরা আশা করি- ভবিষ্যৎ প্রজন্ম আমাদের এই ঐতিহ্য সুনামের সঙ্গে রক্ষা করবে।