অনলাইন সংস্করণ | ভোলা, বুধবার, ২৫শে নভেম্বর ২০২০ | ১১ই অগ্রহায়ণ ১৪২৭


আজও থামেনি স্বজনহারাদের কান্না


বাংলার কণ্ঠ প্রতিবেদক

প্রকাশিত: ১২ই নভেম্বর ২০২০ রাত ১২:০৭

remove_red_eye

৩০

আজ সেই ভয়াল  ১২ নভেম্বর

এম. হাবিবুর রহমান : আজ ভয়াল সেই ১২ নভেম্বর। আজকের মতো সেদিনও ছিলো বৃহস্পতি বার। পবিত্র রমজানের ৪ দিন। ৭০ সালের এ দিনে মহাপ্রলয়ংকারী ধ্বংসযজ্ঞ যা উপকূলীয় অঞ্চল ভোলা মহকুমার উপর ঘটেছিলো। বিগত একশ বছরে উপমহাদেশের প্রাকৃতিক দুযোর্গ গুলোর ৭০ এর ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ¡াস সম্ভবত সবচেয়ে প্রাণ সংহারী ছিলো। সেই সময়ে ধারণা করা হয়েছিলে জলোচ্ছ¡াস ও প্রলয়ংকারী এই দুযোর্গে দেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপকূল জুড়ে প্রায় ১০ লাখ আদম সন্তান প্রাণ হারিয়েছিল। একমাত্র ভোলায় প্রায় দেড়  লক্ষাধিক লোক প্রাণ হারিয়েছে। আসংখ্য সম্পদ বিরাণ হয়েছে। উত্তাল মেঘনা নদী ও তার শাখা- প্রশাখাগুলো রূপান্তরিত হয়েছিলো লাশের নদীতে। মেঘনার পাড়ে গিয়ে দেখা গেলো Ñ মেঘনা নদী নয় যেন লাশের একটি সুশৃঙ্খল মিছিল বহমান। সে কি ভয়াবহ দৃশ্য। সে স্মৃতি মনে পড়লে গা ছম ছম করে আজও আঁতকে উঠি।
১১ নভেম্বর বুধবার থেকেই গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি হতে লাগল। তার আগে কিছু দিন থেকে অসম্ভব গরম পড়ছিলো। পর দিন ১২ নভেম্বর আবহাওয়া আরো গরম হতে লাগলো। কিন্তু তৎকালীন রেডিও পাকিস্তান আবহাওয়া দপ্তরের কোন সংকেত ছিলো না। মনে পড়ে যখন রোম নগরী পুড়ছিলো আর স¤্রাট নিরু তখন করুন সুরে বাঁশি বাজাচ্ছিল। তেমননি ভোলাসহ উপকূল অঞ্চলে যখন প্রাকৃতিক ধ্বংসযজ্ঞ জলোচ্ছ¡াস চলছিলো তখন  রেডিও পাকিস্তানে জনপ্রিয় ভারতীয় গানের অনুরোধের আসর চলছিলো। সেদিন ছিলো ভরা পূর্ণিমা। মাঝ রাত থেকেই ফুসে উঠতে লাগলো সমুদ্র। বঙ্গপোসাগরের পানি পাহাড় সমান উচু হয়ে মেঘনা ও উপকূলবর্তী লোকালয়ের দিকে ধেয়ে আসলো। পঁচিশ ত্রিশ উচু ঢেউ ওয়াবদার বেড়ীবাধের উপর দিয়ে আছড়ে পড়ে জনপদের উপর। মুহূর্তে ভাসিয়ে নিয়ে গেলো মানুষ, গবাদি পশু, বাড়িঘর আর ক্ষেতের সোনালী ফসল। বিরাণ প্রান্তরে আর উন্মুক্ত আকাশের নিচে পড়েছিলো কেবল লাশ আর লাশ। শিয়াল, কুকুর আর শকুনে খেয়েছে কত যে লাশ তার ইয়ত্তা নেই। সত্তরের সেই কালো রাতের কথা মনে পড়লে ধূসর স¥ৃতিতে চোখের সামনে সব কিছু ঝাপসা হয়ে আসে। দেখেছি সাপ আর মানুষ দৌলতখানের চৌকিঘাটে জড়িয়ে পড়ে আছে। স্নেহময়ী মা তার শিশুকে কোলে জড়িয়ে মেঘনা তটে পড়ে আছে। মির্জাকালুর সোনাপুর ইউনিয়নের একটি বাগানে  গাছের ডালে এক মহিলার লাশ ঝুলছে। আর একটি কুকুর লাফিয়ে লাফিয়ে তা খাওয়ার চেষ্টা করছে।
ভোলা সদরের শিবপুর বাজারের সরকারি পুকুরের পাড়ে পাড়ে অগনিত লাশ আর লাশ পড়েছিলো। মনপুরার সতেরো হাজার মানুষ মেঘনা আর বঙ্গপোসাগরে ভেসে গেছে। নদীতে গবাদি পশু আর বনি আদম সন্তান সারিবদ্ধভাবে ভাসছে। জনমানব শূণ্য হয়ে পড়েছিলো দ্বীপটি। মনে হয়েছিলো যেন কোন দৈত্য দানব এক মুহূর্তে সমস্ত জনপদকে নিশ্চিহ্ন করে গেছে।
ভোলার পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের বাসিন্দা সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা তোফাজ্জল হোসেন জানান, ৭০ সনের ১২ নভেম্বর ঝড়ের দিন তারা সবাই ঘরে ছিলেন। ঝড়ের মধ্যে মা পরিস্থিতি দেখতে উঠানে গেলে হঠাৎ  মেঘনা নদীর ফুসে ওঠা পানিতে তার মাকে ভাসি নিয়ে যায়। তার পর আজ পর্যন্ত তার কোন হদিস মিলেনি। সেই দিনটি এলে তোফাজ্জল হোসেন মায়ের জন্য এখনো মেঘনার তীরে বসে থাকেন। এরকম বহু মানুষ স্বজনদের হারিয়ে আজও ডুকরে কেঁদে উঠেন। পঞ্চশ বছরেও স্বজনহারাদের কান্না থামেনি।
তৎকালীন দৈনিক পূর্বদেশ পত্রিকার ভোলা প্রতিনিধি বর্তমান দৈনিক বাংলার কণ্ঠ পত্রিকার সম্পাদক ও ভোলা প্রেসক্লাবের সভাপতি এম হাবিবুর রহমানের করা প্রতিবেদনের মাধ্যমে চার দিন পর ভোলার এই ধ্বংসযজ্ঞের সংবাদ পেয়েছিলো দেশবাসীসহ সারা বিশ্ব। এম, হাবিবুর রহমানের সবিত্র প্রতিবেদন “বাংলার মানুষ কাঁদো, ভোলার গাছে গাছে ঝুলছে লাশ” শিরোনামে প্রকাশিক সেই সচিত্র প্রতিবেদনটি আজও ঢাকার প্রেসইনসটিটিউটের দেয়ালে বাঁধানো অবস্থায়র প্রদশিত হচ্ছে।