বড় ধরনের অনিয়মের আশঙ্কায় ১৯৯৪ সালে বেসরকারি খাতের ওরিয়েন্টাল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। এরপরও বড় ধরনের অনিয়মের ঘটনা ঘটায় ২০০৬ সালে পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে প্রশাসক নিয়োগ দিয়ে ব্যাংকটির নিয়ন্ত্রণ নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। পরবর্তী সময়ে ২০০৮ সালে এটির নাম পরিবর্তন করে আইসিবি ইসলামিক ব্যাংক করা হয়।

রাষ্ট্রমালিকানাধীন জনতা ব্যাংকে ২০১৫ সালের নভেম্বরে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এরপরও ব্যাংকটি থেকে অ্যাননটেক্স ও ক্রিসেন্ট গ্রুপ অবৈধভাবে বিভিন্ন ঋণসুবিধা নিয়েছে,যার জন্য এখন বড় বিপদে পড়েছে ব্যাংকটি। একই অবস্থা বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল, এবি, ইসলামীসহ পর্যবেক্ষক থাকা আরও কয়েকটি ব্যাংকে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষকেরা দায়িত্ব পালন সত্ত্বেও থামাতে পারছেন না ব্যাংকগুলোর নানা অনিয়ম, আবার ব্যাংকগুলোর অবস্থারও কোনো উন্নতি ঘটাতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে পর্যবেক্ষকদের ভূমিকা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা অবসরের পর ওই ব্যাংকেই উচ্চ পদে চাকরি নেন। জানা গেছে, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা ইউসুফ হারুন আবেদী, প্রিমিয়ার ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা মীর আবদুর রহিম ও পূবালী ব্যাংকে দায়িত্ব পালন করা খুরশিদ উল আলম অবসরের পর ওই ব্যাংকগুলোতে চাকরি নেন।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ এ নিয়ে প্রথম আলোকে বলেন, পর্যবেক্ষকদের হাতে তেমন কোনো ক্ষমতা নেই, তাঁরা চাইলেও কিছু করতে পারছেন না। এ কারণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন ও পর্যবেক্ষকদের সুবিধা নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটছে। এভাবে পর্যবেক্ষক রেখে লাভ নেই, যদি রাখতেই হয়, তবে তাঁদের পর্যাপ্ত ক্ষমতা দিতে হবে। পাশাপাশি পর্যবেক্ষকদের জবাবদিহির বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে।

কোনো ব্যাংকের পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কা থাকলে বা খারাপ হয়ে গেলে ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুযায়ী ওই ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। নিয়ম অনুযায়ী, এসব পর্যবেক্ষক ব্যাংকের পর্ষদ, নির্বাহী ও নিরীক্ষা কমিটির সভায় অংশ নিতে পারেন। তবে মতামত দিতে পারেন না। কোনো আপত্তি থাকলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগে মতামত দিতে পারেন। যার ভিত্তিতে ব্যবস্থা নেয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

জানা গেছে, বর্তমানে ১২টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ রয়েছে। এর মধ্যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে নির্বাহী পরিচালক পর্যায়ের কর্মকর্তা ও অন্যান্য ব্যাংকে মহাব্যবস্থাপক পর্যায়ের কর্মকর্তাকে পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১৫ সালে সোনালী, অগ্রণী, জনতা, রূপালী, কৃষি ও বিডিবিএলে পর্যবেক্ষক দেওয়া হয়। আইসিবি ব্যাংকে ১৯৯৪ সালে, ন্যাশনাল ও কমার্স ব্যাংকে ২০০৪ সালে, বেসিক ব্যাংকে ২০১৩ সালে, ইসলামী ব্যাংকে ২০১০ সালে, এনআরবি কমার্শিয়াল ও ফারমার্স ব্যাংকে (পদ্মা) ২০১৬ সালে এবং এবি ব্যাংকে ২০১৭ সালে পর্যবেক্ষক বসানো হয়।

জানা গেছে, ২০১৫ সাল থেকে জনতা ব্যাংকে পর্যবেক্ষক থাকার পরও বড় ধরনের ঋণ অনিয়ম হয়েছে। কিন্তু ওই পর্যবেক্ষক অনিয়মের বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি। গত বছর ব্যাংকটিতে নতুন পর্যবেক্ষক গেলে অনিয়মের বিষয়ে বিভিন্ন মতামত দেওয়া শুরু করেন। ফলে ব্যাংকটির প্রকৃত অবস্থা বের হচ্ছে। ন্যাশনাল ব্যাংকে ২০১৪ সাল ও এবি ব্যাংকে ২০১৭ থেকে পর্যবেক্ষক থাকলেও ঋণ অনিয়মের বিষয়ে কোনো ভূমিকা রাখতে পারছেন না। আর ইসলামী ব্যাংকের অবস্থা খারাপ হয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষক যাওয়ার পরই।

পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্বরত ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অন্য কর্মকর্তারা বলছেন, অনেকে সময় পর্ষদে অনুমোদনের দিনই ঋণ তুলে নিয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে লিখিত মতামত কোনো কাজে আসে না। আবার যাঁরা পর্যবেক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের সবাই তেমন দক্ষও নন। এ কারণে অনিয়মও ধরতে পারছেন না।