হাসনাইন আহমেদ মুন্না || ভোলায় গত ১০ বছরে (২০০৯-১৮) পরিবার পরিকল্পনা পদ্ধতি গ্রহণকারীর হার বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ১৪ ভাগ। বর্তমান সরকারের এই খাতে জনবল নিয়োগ, ব্যাপক প্রচার-প্রচারণা ও সঠিক কর্ম পরিকল্পনার কারণেই অগ্রগতী সাধিত হয়েছে। এসবের মধ্যে রয়েছে নারীদের খাবার বড়ি, পুরুষের কনডম, নারীদের ইনজেকটেবল (ইঞ্জেকশন), নারীদের আইইউডি, ইমপ্লান্ট ও স্থায়ী পদ্ধতি। মাঠ পর্যায়ের পরিদর্শীকারা প্রত্যন্ত অঞ্চলের বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে এসব সামগ্রী বিতরণ করে আসছেন। এতে করে এখানকার জনসংখ্যার আধিক্য, মাতৃ ও শিশু মৃত্যুর হার কমে এসছে। তাই সাধারণ মানুষের মধ্যে পরিকল্পিত পরিবার গঠনের আগ্রহ বাড়ছে।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্র জানায়, ‘দুটি সন্তানের বেশি নয় একটি হলে ভালো নয়’ এই ¯েøাগান নিয়ে জেলায় পরিবার পরিকল্পনা বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিবছরই জেলায় পদ্ধতি গ্রহণের হার বাড়ছে। ২০০৯ সালে এর হার ছিলো ৬৮.৭২ ভাগ। পরের বছর ২০১০ সালে বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৭০.৪৪। ২০১১ সালে ছিলো ৭৩.৪১। ২০১২ সালে হয়েছে ৭৫.৩০। ২০১৩ সালে এই হার দাড়িয়েছে ৭৪.৮৮। ২০১৪ হয়েছে ৭৬.৯৩।
একইভাবে ২০১৫ সালে ৭৯.৮২। ২০১৬ সালে হয়েছে ৮০.৭৮ ভাগ। ২০১৭ সালে ব্যবহারকারীর হার ৮১.৯৪ ও ২০১৮ সালে বেড়ে হয়েছে ৮২.৩৪ ভাগ। বর্তমানে জেলায় এর গ্রহণযোগ্যতা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের উপ পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) মাহমুদুল হক আযাদ বলেন, বর্তমান সরকারের ব্যাপক প্রচার-প্রচারণার ফলে এই খাতে অনেক উন্নয়ন হয়েছে। বিশেষ করে বর্তমানে মানুষকে সচেতনতার মাধ্যমে প্রায় অধিকাংশ নতুন দম্পতি জন্ম নিয়ন্ত্রন ব্যবহার করছেন। মানুষ দিন দিন অজ্ঞতা ও কৃসংস্কার থেকে বেড়িয়ে আসছেন। ফলে নারীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিও কমে আসছে। অনেকটাই রোধ করা সম্ভব হয়েছে শিশু ও মাতৃ মৃত্যু।
তিনি আরো বলেন, পূর্বে যেখানে একজন মা গড়ে ৬টির বেশি সন্তান প্রসব করতেন। আর এখন ২ টি অথবা ১টি সন্তান জন্ম দেন। পরিবার পরিকল্পনার মাধ্যমে আমাদের জনসংখ্য নিয়ন্ত্রন করা সম্ভব হয়েছে। যার সুফল ইতোমধ্যে আমরা ভোগ করছি।
পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রকৃতিগতভাবে ভোলা দ্বীপ জেলা হওয়ায় এখানে ধর্মীয় গোড়ামী ও কুসংস্কারচ্ছন্ন অধিকাংশ মানুষ। বিগত দিনে জন্ম নিয়ন্ত্রনকে পাপ বলে মনে করতো অনেকে। কেউ কেউ আবার লজ্জা বা জড়তায় প্রকাশ করতে পারতো না। একাধীক সন্তান জন্মের মাধ্যমে দরিদ্র পরিবারগুলোর অভাব লেগেই থাকতো। অধীক সন্তান প্রসবের কারণে অতি মাত্রায় স্বাস্থ্যহীনতায় ভুগতেন মায়েরা।
তারা আরো জানান, যদিও বর্তমান সরকারের আমলে মানুষ এখন অনেক সচেতন হয়েছে। শিক্ষার হার বেড়েছে, জীবনমান উন্নত হয়েছে। ব্যাপক প্রচারণা ও কর্মকান্ডের সম্প্রসারনে পরিবার পরিকল্পনা বেশ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বিশেষ করে অবহেলিত গ্রামঞ্চলের দরিদ্র পরিবারগুলো বিনামূল্যে ঘরে বসে জন্ম নিয়ন্ত্রন সামগ্রী হাতে পেয়ে দারুন খুশি। অনেকের পক্ষেই অর্থ দিয়ে নিয়মিত এসব পন্য কেনা সম্ভব নয়।
দৌলতখান উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: অচিন্ত্য কুমার ঘোষ বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে মানুষ জন্ম নিয়ন্ত্রনে আগ্রহী হচ্ছে। এর কারণ হলো আমাদের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষ যত শিক্ষিত হবে গোড়ামী তত কমে যাবে এবং সচেতনতা তত বৃদ্ধি পাবে। গ্রামের সাধারণ মানুষ আগে মনে করত সন্তান বেশি হলে তাদের কাজে সহাজ্য করতে পারবে। এখন তারা বুঝতে পেরেছে একটি বা দুটি সন্তান হলে তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি নিশ্চিত করা অনেক সহজ হয়। কাজেই সন্তান শিক্ষিত ও সুনাগরিক হলে বাবা-মাকে অনেক বেশি সহায়তা করতে পারে।
সদর উপজেলার দক্ষিন দিঘলদী ইউনিয়নের দক্ষিন বালিয়া গ্রামের ৪ নং ওয়ার্ডের ভেরিবাধ’র বাসিন্দা সামসুল আলম, আবু হানিফা, কালাম মাঝি বাসস’কে জানান, তারা সকলেই মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। তাদের পক্ষে অধিক সন্তান পালন অত্যন্ত ব্যয়সাধ্য। তারা দেখেছেন বেশি সন্তান থাকার কুফল। তাই তারা জন্ম নিয়ন্ত্রন পদ্ধতি ব্যবহার করেন।
শীবপুর ইউনিয়নের শান্তির হাট এলাকার গৃহবধু রোকসানা বেগম, লাইজু বেগম, সফুরা খাতুন ও সেফালী বেগম বলেন, আগে না বুঝলেও এখন তারা বুঝতে পেরেছেন ছোট পরিবারেই সূখ বেশি। সন্তান কম থাকলে তাদের মানুষ করতে সহজ হয়। ফলে তারা এখন সচেতন ও পদ্ধতি গ্রহণ করেন।